নোবেল পুরস্কার ২০২১

লেখক - ডঃ শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

                                             

পদার্থবিজ্ঞান

'হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে'

'পৃথিবীর জলবায়ু একটা জটিল গাণিতিক মডেল। তবু সেটাও সহজবোধ্য, অন্ততঃ পৃথিবীর বর্তমান রাজনৈতিক প্যাঁচপয়জারের তুলনায়!'

   ----শুকুরো মানাবে।

বিগত ৬ই অক্টোবর পৃথিবীর জলবায়ু-সংক্রান্ত মডেল এবং আনুষঙ্গিক গাণিতিক গবেষণার ফলস্বরূপ পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন জাপানী-আমেরিকান বিজ্ঞানী শুকুরো মানাবে (বয়স ৯০), জার্মান বিজ্ঞানী ক্লাউস হ্যাসেলমান (বয়স ৮৯) এবং ইতালীয় বিজ্ঞানী জর্জিও প্যারিসি (বয়স ৭৩)। মানাবে বর্তমানে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। হ্যাসেলম্যান হামবুর্গের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর মিটিয়রোলজির অধ্যাপক। তাঁরা দুজনে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারের মোট অর্থমূল্যের অর্ধেক পাচ্ছেন, আর রোমের স্যাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্যারিসি পাচ্ছেন বাকি অর্ধেক অর্থমূল্য। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বিশ্ব-উষ্ণায়ণের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে জার্মানির গ্লাসগোয় আয়োজিত হতে চলেছে কপ২৬ সামিট--- সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে এই বছরের এই যে 'একটু অন্যরকম' পদার্থবিদ্যা-নোবেল, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন নোবেল-কমিটির সদস্যরা‌।

এককথায় বলতে গেলে, মানাবে আর হ্যাসেলম্যানের কাজ পৃথিবীর এই যে জলবায়ু, তার জন্য একটা উপযুক্ত গাণিতিক মডেল তৈরি করা যার দ্বারা জলবায়ুর ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ব্যাখ্যা করা যায়। অন্যদিকে, প্যারিসির কাজ এসবের সাথে জুড়েছে জটিল সিস্টেমের বিশৃঙ্খলা এবং আকস্মিক পরিবর্তন-বিষয়ক জটিল অঙ্কের হিসেব-নিকেশ।

আমাদের বায়ুমণ্ডলে কার্বনডাইঅক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির অর্থাৎ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর যে পরিষ্কার সম্পর্ক রয়েছে, তাই নিয়ে অধ্যাপক মানাবে কাজ করে আসছেন সেই ১৯৬০ সাল থেকে। আসলে কার্বনডাইঅক্সাইডের থেকেও জলীয় বাষ্প যে এ ব্যাপারে বেশি দায়ী সেটা তিনিই প্রথম গবেষণা করে দেখিয়েছেন। কম্পিউটারের ব্যবহারের সেই আদিমযুগে, বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, গ্লোবাল ওয়ার্মিং-সংক্রান্ত তাঁর পাহাড়প্রমাণ গবেষণা এখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে মাইলফলকের সমান।

অন্যদিকে, বিজ্ঞানী হ্যাসেলম্যানের গবেষণা থেকে জানা গেছিল যে জলবায়ুর‌ও দস্তুরমত 'ফিঙ্গারপ্রিন্ট' হয় এবং আরো আশ্চর্যের বিষয় এই যে সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রভাবিত হয় মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের মাধ্যমে। জ্বালানি হিসেবে কয়লা আর খনিজ তেলের ক্রমাগত ব্যবহার আগামী তিরিশ থেকে একশো বছরের মধ্যেই ডেকে আনবে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন, আমাদের ভবিষ্যতের এমন ছবিই ফুটে উঠেছে হ্যাসেলম্যানদের কাজের মাধ্যমে।

১৯৮০-এর দশকে জটিল সিস্টেমের বিশৃঙ্খলা এবং আকস্মিক পরিবর্তন-বিষয়ক বিজ্ঞানী প্যারিসির গবেষণা ছাড়া জলবায়ুর একটা পূর্ণাঙ্গ মডেল গড়ে তোলা সম্ভব হত না, এমনটাই মনে করছেন নোবেল-কমিটি। কোনো অঞ্চলের জলবায়ু আসলে দৈনন্দিন আবহাওয়ার‌ই একটা দীর্ঘকালীন জটিল সিস্টেম বলা যায়। এই সিস্টেমের গতিপ্রকৃতি আপাতদৃষ্টিতে হঠাৎ হঠাৎ পাল্টে যায়‌, তবু এই পাল্টে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন। প্যারিসির কাজ সেই প্যাটার্ন নিয়েই। শুধু জলবায়ুবিজ্ঞানেই নয়, এই কাজ অঙ্ক, জীববিজ্ঞান এবং মেশিন-লার্নিং-এর মত ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, এই নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক জর্জিও প্যারিসির দখলে।  

পদার্থবিদ্যায় জলবায়ু-সংক্রান্ত কাজের জন্য নোবেল এই প্রথম দেয়া হচ্ছে। এর ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটাই সম্ভবতঃ বড় বড় বিজ্ঞানীরা জানান দিতে চাইছেন পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রনায়কদের। আর সময় নেই এ নিয়ে ভাবার, বরং সময় এসেছে এটা নিয়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেবার।

                                                       

রসায়ন

জৈব-অণুর 'সিলেক্টিভ' ঘটকালি

'এমন সোজা জিনিসটা আগে যে কারো মাথায় আসেনি, এইটাই সবচাইতে বড় আশ্চর্যের ব্যাপার!'

---জোহান আকভিস্ট,

চেয়ারম্যান,

রসায়ন নোবেল-কমিটি

জার্মান বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন লিস্ট আর মার্কিন বিজ্ঞানী ডেভিড ম্যাকমিলান এ বছরের রসায়ন-নোবেল পুরস্কার পেলেন। লিস্ট বর্তমানে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কোল রিসার্চের ডিরেক্টর এবং ম্যাকমিলান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং গবেষণারত। আজ থেকে প্রায় একুশ বছর আগে রসায়নের জগতে তাঁরা এমন একরকমের অনুঘটকের ব্যবহার শুরু করেন, যাতে করে আজ পৃথিবীর তাবড় রসায়নশিল্পের উৎপাদনক্ষমতার হার বেড়ে গেছে বহুগুণে।

আমাদের চারপাশে যতরকম জিনিসের ছড়াছড়ি তাদের সবকিছুই তৈরি হয়েছে কোনো না কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। সে বিক্রিয়া হয় প্রকৃতিতে ঘটেছে অথবা মানুষ নিজে পরীক্ষাগারে ঘটিয়েছে। এইরকম বিক্রিয়ার সবগুলোর গতি সমান হয় না। প্রকৃতি বা মানুষ নিজে সুবিধার জন্য বিক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে বা কমিয়ে উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। প্রকৃতি এইজন্য ব্যবহার করে উৎসেচক নামে একধরনের প্রোটিন অণুকে। অন্যদিকে মানুষ সাহায্য নেয় বিভিন্ন ধাতব যৌগের। এইসব পদার্থ, যাদের ব্যবহার করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাদের সুইডিশ বিজ্ঞানী বার্জেলিয়াস সেই কবে ডেকেছিলেন 'ক্যাটালিস্ট' বা অনুঘটক বলে। যাই হোক, উৎসেচক আর ধাতব যৌগ, এই দুইরকম অনুঘটকের বাইরেও যে তৃতীয় একশ্রেণীর অনুঘটক সম্ভব, আর সেটা তৈরি হতে পারে পাতি কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাসের পরমাণুদের দিয়েই, সে কথা লিস্ট এবং ম্যাকমিলানের যুগান্তকারী আবিষ্কারের আগে আর কেউ ভেবে উঠতে পারেন নি।

দুই বিজ্ঞানীই নিজের নিজের দেশে স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন এইরকম অনুঘটক নিয়ে। অণু‌ মাত্রই ত্রিমাত্রিক। এর মধ্যে বিভিন্ন পরমাণুগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং নির্দিষ্ট কোণে নিজেদের সাজিয়ে নেয়। বেশিরভাগ অণুরা তাই একরকম ত্রিভঙ্গমুরারি কিংবা অষ্টাবক্রের মত বেঁকেচুরে থাকে। জৈব যৌগের অণুগুলো এ ব্যাপারে সবচাইতে কায়দাবাজ। এদের মধ্যে কিছু কিছু অণুর চেহারা এমনি যে তাকে আয়নায় ধরলে যে ছায়া পড়বে, ঠিক অমনি ছায়ার মত দেখতেও আরো একরকমের জৈব অণু পাওয়া যায়। অণুদের আয়নাতুতো এই ভাইদুটির মধ্যে আর সব ব্যাপারে যত‌ই মিল থাকুক, কিছু কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এদের তফাৎ দিব্যি ধরতে পাওয়া যায়। প্রকৃতি বিভিন্ন রকম কায়দায় রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে আয়নাতুতো এই অণুদুটোর মধ্যে যে কোনো একটাকে নির্দিষ্টভাবে বেছে নিয়ে নির্দিষ্ট একটা কাজে লাগায়। যেমন, কমলালেবুর গন্ধের জন্য প্রকৃতি যে অণুকে কাজে লাগিয়েছে, পাতিলেবুর মধ্যে তার গন্ধের জন্য পুরে রেখেছে ঠিক তার অমনি আয়নাতুতো অণুভাইকে। ঘটনা হচ্ছে, মানুষ এই পদ্ধতিকে এখনও পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে নি। তবে ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত রসায়নবিজ্ঞানীরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে, উৎসেচক আর ধাতব যৌগদের অনুঘটকরূপে ব্যবহার করে ঐরকম আয়নাতুতো অণুদের মধ্যে যেকোনো একটাকে হয় বেশি পরিমাণে বানাতে পেরেছেন আর নয়তো কেবল একটাকেই নির্দিষ্টভাবে তৈরি করার কৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। এইধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার নাম অ্যাসিমেট্রিক বা অপ্রতিসম বিক্রিয়া।

২০০০ সাল থেকে বিজ্ঞানী লিস্ট আর ম্যাকমিলানের গবেষণার সৌজন্যে সেই অনুঘটকের তালিকায় জুড়েছে মাঝারি আকারের সরল জৈব-অণুদের নাম। আর তাই তাঁদের বানানো এই অনুঘটন পদ্ধতির পারিভাষিক নাম: 'অ্যাসিমেট্রিক অর্গানোক্যাটালিসিস'। আমাদের চারপাশে ওষুধ, রঙ থেকে শুরু করে সৌরকোষের উপাদান পর্যন্ত জৈব অণুর যে রমরমা বাজার, এতদিন ধরে সেটা সম্ভব হয়েছে এই দুই বিজ্ঞানীর দেখানো আশ্চর্য অথচ সরল রাস্তা ধরেই। তার‌ই ফলশ্রুতি, এবারের এই রসায়নের নোবেল পুরস্কার।

                                               

শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসা

'একটুকু ছোঁয়া লাগে' বনাম 'চাপের ব্যাপার'

'যে বিষয়ে বেশি কিছু জানা যায় নি, সেই বিষয়ে কাজ করবার সুযোগ‌ও সবচাইতে বেশি!'

---আর্ডেম প্যাটাপুটিয়ান

বিগত ৪ঠা অক্টোবর এ বছরের শারীরবিদ্যা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের নোবেল পুরস্কার পেলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ‌্যার অধ্যাপক ডেভিড জুলিয়াস এবং ক্যালিফোর্নিয়ার‌ই স্ক্রিপস্ রিসার্চের মলিকিউলার বায়োলজিস্ট আর্ডেম প্যাটাপুটিয়ান। ডেভিড হচ্ছেন মার্কিনি এবং আর্ডেম জন্মসূত্রে আর্মেনীয় হলেও বর্তমানে তিনিও মার্কিনি।‌ আমাদের স্নায়ুকোষের মধ্যে একরকম তাপ-সংবেদী প্রোটিন থাকে যারা বাইরের পরিবেশের উষ্ণতা বেড়ে গেলে সাড়া দেয়। আমরা তখন সেই উষ্ণতা অনুভব করি। বিজ্ঞানী জুলিয়াসের নিরন্তর গবেষণা এই প্রোটিনটা শনাক্ত করেছে। অন্যদিকে কোষ কিরকম যান্ত্রিক চাপ কতটা পরিমাণে এবং ঠিক কিভাবে নিতে ও বুঝতে পারে, তাই নিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন বিজ্ঞানী প্যাটাপুটিয়ান।

পাঁচ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা না হয় রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের অনুভূতিগুলো বুঝতে পারি, কিন্তু আণবিক-স্তরে ঠিক কি ঘটছে সেটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবে বার করতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। শ্রবণ অর্থাৎ শব্দের অনুভূতির বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য ১৯৬১ সালে, ১৯৬৭ সালে রূপ অর্থাৎ দর্শনের অনুভূতি আর ২০০৪ সালে গন্ধের অনুভূতির আণবিক বিশ্লেষণের জন্য নোবেল বরাদ্দ হয়েছিল। আর গন্ধের সাথে যে রস অর্থাৎ স্বাদ সম্পর্কিত, সেটা সকল করোনাভুক্ত রোগীই বিলক্ষণ টের পেয়েছেন। বাকি রয়ে গেছিল এই স্পর্শের অনুভূতির সঠিক আণবিক বিশ্লেষণ। এইখানে একটা মুশকিল হচ্ছে, বাকি অনুভূতিগুলোর ইন্দ্রিয় এক-একটা নির্দিষ্ট অঙ্গেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু স্পর্শের ইন্দ্রিয় ত্বক ছেয়ে আছে গোটা শরীরের উপরেই। ত্বকের দুটো প্রধান অনুভবের কাজ হচ্ছে ঠাণ্ডা-গরমের তফাৎ বোঝা আর কম চাপ-বেশি চাপের পার্থক্য ধরা আর সেইমত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। এই কাজটা কিভাবে রাসায়নিক অণুরা কোন্ রাস্তায় করায়, সেইটা এবার বিজ্ঞানীদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলা যাক এবার।

এই করোনাকালে মেট্রোয় চড়তে গেলে এখন টিকিটের বদলে একটা স্মার্ট কার্ড লাগছে একশো টাকার। সারা বছরের জন্য ওটা কাজে লেগে যাবে। সেই কার্ড প্ল্যাটফর্ম ঢোকার গেটের একটা বিশেষ জায়গায় ঠেকালে গেট খুলে যায়। তখন সেই খোলা গেট দিয়ে বৈধ যাত্রী ঢুকতে পারে আর চড়তে পারে মেট্রোরেলে। গন্তব্যে পৌঁছে স্টেশন থেকে বেরোতে আবার গেটে সেই কার্ড ছোঁয়াতে হয়। গেট খুলে যায় আর যাত্রী বেরিয়ে আসতে পারে। অর্থাৎ কাউন্টারে টাকা দিয়ে কেনা স্মার্টকার্ড ছাড়া কোনো যাত্রী মেট্রোয় কিছুতেই উঠতে পারছেন না।

ঠিক এই ব্যবস্থাটাই একটা জীবন্ত কোষের ক্ষেত্রেও কাজ করে। কোষ ঘিরে থাকে কোষের পর্দা। এই পর্দা হচ্ছে মেট্রোর গেটের মত। স্মার্ট কার্ডের মত কিছু প্রোটিন থাকে, যাদের ছাড়া এই পর্দা পেরিয়ে কোনো অণু বা আয়ন কোষের ভিতরে ঢুকতে পারে না অথবা কোষ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। ঐসব প্রোটিনের অণু যেই কোষপর্দার গায়ে আটকায়, অমনি মেট্রোর গেটের মত পর্দাটার একটা জায়গা খুলে যায়। এই জায়গাগুলোকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'আয়ন-চ্যানেল'। সেই চ্যানেল দিয়ে তখন যাত্রীর মত আয়নরা সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ে বা বেরিয়ে আসে। এইভাবে কোষের বাইরে আর ভিতরে আয়নের পরিমাণের পার্থক্য হলে তবেই তো বৈদ্যুতিক সিগন্যাল বা সঙ্কেত সৃষ্টি হবে, আর আমাদের ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি জেগে উঠবে।

ত্বকের স্নায়ুকোষ ঠাণ্ডা বা গরমের অনুভব করাতে এইরকম একটা প্রোটিন অণু ব্যবহার করে, TRPV1 হচ্ছে যার পারিভাষিক নাম। বিজ্ঞানী জুলিয়াসের ল্যাবরেটরিতেই এই প্রোটিন শনাক্ত হয়। এখন প্রোটিন অণু তৈরির পিছনে কলকাঠি নাড়ে কোষের নিউক্লিয়াসে বসে থাকা ডিএন‌এ-এর ফিতের বিভিন্ন অংশ। কাজের সুবিধার্থে, TRPV1 প্রোটিন তৈরির নির্দেশ আসে যে অংশ বা জিন থেকে, জুলিয়াসরা সেই নির্দিষ্ট জিনটাকেও শনাক্ত করেছেন। এই প্রোটিনের অণুটাকে ধরতে তারা যে আণবিক ফাঁদ ফেঁদেছিলেন সেটা হচ্ছে ক্যাপসাইসিন, যে রাসায়নিকটা পাওয়া যায় কাঁচা লঙ্কার মধ্যে। আসলে লঙ্কার ঝালের জন্য এই উপাদানটাই দায়ী। অর্থাৎ ক্যাপসাইসিন অণু, মানে আপনি কিনেছেন স্মার্টকার্ড, অর্থাৎ TRPV1 প্রোটিন, তাই দিয়ে খুলেছে মেট্রোর গেট অর্থাৎ কোষপর্দার আয়ন-চ্যানেল, আর তার মাধ্যমে আপনার উষ্ণতার অনুভব শুরু। ঝাল লাগার এই অনুভূতির জন্য দায়ী যে আয়ন-চ্যানেলগুলো, তারাই যে আবার উষ্ণতার অনুভবের জন্য‌ও দায়ী, এমন আশ্চর্য ব্যাপার প্রথম জানা যায় জুলিয়াসদের গবেষণা থেকেই।

অন্যদিকে, আর্ডেম প্যাটাপুটিয়ান কাজ শুরু করেছিলেন কোষের গায়ে পিপেট ফুটিয়ে। এই পিপেট আমাদের কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে হাতে ধরতে পারা যায় এমন পিপেট নয় অবশ্য। একে মাইক্রোস্কোপেই দেখা সম্ভব। জুলিয়াসদের মত‌ই স্পর্শ কিংবা চাপের জন্য দায়ী এরকম একটা প্রোটিন এবং তাকে তৈরি করে এমন জিন শনাক্ত করেছেন আর্ডেমরা। জুলিয়াস এবং প্যাটাপুটিয়ানদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ক্রনিক ব্যথার রোগীর ক্ষেত্রে তো বটেই, অন্যান্য রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে বলে নোবেল-কমিটির সদস্যরা মনে করছেন।

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb