ইরোর অভিযান

লেখক - অবন্তী পাল

 

‘মামু, আমার দারুন আনন্দ হচ্ছে! কখন উড়বো আমরা? আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না’ একঝাঁক অবিন্যস্ত কোঁকড়ানো চুল মাথায় ছোট্ট বালকটার চোখে অবাধ কৌতূহল আর উত্তেজনার মিশ্রণ।

‘একটু পরেই ছাড়বে ইরো। তুমি তো জানো, আমাদের আজকের হট্-এয়ার-বেলুন সফর শুধুমাত্র বেড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়। আগেই বলেছিলাম, এক বিশেষ গবেষণার কারণে আমাকে এক প্রত্যন্ত এলাকায় পাড়ি দিতে হচ্ছে। আমাদের পথপ্রদর্শক, আমার সহকর্মচারী মিস্টার লুবরে আমাদের সাথে যাবেন। উনি শেষমুহূর্তের কিছু প্রশাসনিক কাজ মিটিয়েই উঠে পড়বেন বেলুনে, তারপরই আমরা পাড়ি দেবো আকাশপথ বেয়ে’

খুশির হাজার প্রদীপ জ্বলে উঠলো ছোট্ট ইরোর চোখে। দুই বছর বয়সেই ইরোর বাবা-মা অজানা কারণে পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। না, ঠিক প্রাণ হারিয়েছিলেন কিনা জানা যায় না আজও। ওনাদের গাড়িটা শহর পেরিয়ে বহুদূরের এক মরু-অঞ্চলে পাওয়া যায়। তবে ওনাদের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। ইরোও ছিল সেদিন ওনাদের সাথে। কিন্তু কোন রহস্যময় কারণে, ওনাদেরকে না পাওয়া গেলেও, ইরোকে গাড়ির ভেতর থেকেই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। সে প্রায় বছর আটেকের আগেরকার কথা। তারপর থেকে তার এই খেপাটে পাগলাটে অবিবাহিত বৈজ্ঞানিক মামু, মিস্টার বয়েস্-এর কাছেই সে মানুষ।

কিছু আব্ছা স্মৃতি মাঝেমধ্যে ভিড় করে ইরোর চোখে। এক ভদ্রমহিলার কোলের মায়াবী আবেশ, বোধহয় ওর মা ছিলেন উনি, আর ওই যে ভদ্রলোক ওকে একটা খেলনা নিয়ে কি সব ম্যাজিক দেখাচ্ছিলেন, উনি মনে হয় ওর বাবা… ওদের ক্ষীণ হাসির সুরধ্বনি কোথা থেকে যেন বেজে ওঠে ইরোর কানে। গভীর ঘুমের মধ্যেও সে দেখতে পায়, গাড়িতে করে বেড়াতে বেরিয়েছিলো এক সন্ধ্যায়, হঠাৎ চারিদিক আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে, পৃথিবী যেন ঝলসে যায়। তীব্র বেগে শোঁশোঁ শব্দে হাওয়া আরম্ভ হয়। বুঝিবা ধুলোঝড় ধেয়ে এলো। ওর মায়ের নরম হাত এসে ওর চোখদুটো সযত্নে ঢেকে দেয় সেই আলোর থেকে রক্ষা করতে। তারপর সব শান্ত হয়ে গেল, সব। ইরো বোধহয় নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। তবে ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল চারদিক অন্ধকার। মা বাবা কই? সেই মনে হয় শেষ দেখা ছিল। একটা আকুল আকাঙ্ক্ষায় সে তাকিয়ে থাকে আজও, শূন্য আকাশে… এই বুঝি ফিরে আসবেন তাঁরা ওর জীবনে, যেমন দমকা হাওয়ার সাথে হারিয়ে গিয়েছিলেন একদিন।

এমন কত নির্জন দুপুর গেছে, যখন অতর্কিতে এক ধাঁধালো দুর্বার আলোকদ্যুতি তীব্রবেগে এসেছে ওর দিকে। চকিতে চোখ বন্ধ করতেই, নিমেষে সেটা বিলীন হয়ে গেছে। সেই অপ্রতিরোধ্য শক্তি যেন বারবার আহ্বান করে ওকে, টেনে নিয়ে যেতে চায় নিজের কাছে। কেউ কি ডাকছে ওকে তবে?

স্নেহ আর অভিভাবকত্বের ত্রুটি না থাকলেও, এসব কথা ইরোর আত্মভোলা মামুর অজানা। উনি সারাদিন নিজের গবেষণাগারেই ব্যস্ত। তবে যতক্ষন পারেন, সঙ্গ দেন আর মশগুল রাখেন ভগ্নীপুত্রকে, নিজের দুর্দান্ত কার্যকলাপের আর নানান রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্পে। এবারের সফরে মামুই ইরোকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। ছেলেটা বড়ই শান্তশিষ্ট। দীঘল চোখের অন্তরালে যেন এক অন্য বিশ্বলোক উঁকি দেয় প্রায়শই।

নামিবিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়েছে ওনার এবারের এক বিশেষ গবেষণার কাজ। সোসুস্ভলেই, নামিব-নোক্লফ্ট ন্যাশনাল পার্ক থেকে বন্দোবস্ত করা হয়েছে, হট্-এয়ার-বেলুনে চড়ে গন্ত্যবস্থলে পৌঁছানোর বিশেষ আয়োজন।

 বেলুন যখন আকাশে উড়ল, তখন শেষ অস্তগামী সূর্যের আলো এসে পড়েছে ইরোর চোখেমুখে। চলেছে ওরা সেদিকেই, যেন দুর্বার গতিতে বেলুন ছুটে চলেছে আজকের দিনটুকু ধরে রাখার অভিপ্রায়ে। তারপর দুধের প্রলেপ লাগিয়ে সহস্র আকাশপ্রদীপ জ্বেলে নামল নক্ষত্রখচিত রাত্রি। ইরোর যেন মনে হলো সেই তারাদের অন্তরালেই হাতছানি দিচ্ছে কত সুড়ঙ্গপথ, তাদের পৃথক বহু-ব্রহ্মান্ড থেকে। নমিত ফিসফিসানিতে, হাওয়ায় কারা যেন চলেছে ওর সাথে, ওদের বেলুনের গতিপথ পরিচালিত করছে। এই অপার্থিব অনুভূতিরা শিহরিত করে তোলে ওকে।

‘কি ইরোবাবু, কেমন লাগছে সফর?’ মামু জিজ্ঞাসা করলেন।

‘অজাগতিক!!’ অস্ফুটে প্রত্যুত্তর এল। ‘আচ্ছা মামু, আলো-হাওয়ারা কথা বলে? তুমি শুনতে পাও?’

‘শুনতে চাইলেই শুনতে পাওয়া যায় ইরোবাবু। নৈঃশব্দে, তাদের মধ্যে মস্ত কোলাহল, কান পাতা দায়! তাই তো আমরা শোনার চেষ্টাও করি না। তাদের তরঙ্গ আমাদের স্পর্শ করলেও, সে সংকেত উদ্ধার করা জাগতিক-আমাদের দ্বারা কল্পনাতীত’

মশগুল হয়ে যায় ওরা গল্পে। নিজের অজান্তেই, একসময়ে শ্রান্ত চোখ বুজে আসে ইরোর।

আচমকা ঘুম ভাঙ্গে এলোপাথারি ঝড়ের ধাক্কায়। অসম্ভব গতিতে হাওয়া দিচ্ছে চারদিকে, আর বেলুন ছুটে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।  বয়েস্ আর  লুবরের চোখেমুখে আতঙ্ক। অযাচিত গুরুভার বিপর্যয়ের অনাহুত আগমনে ওরা উড়ে চলেছে গন্তব্যস্থল থেকে দূরে, বহুদূরে। এমন অবস্থায় বেলুন নামানোর সমস্ত চেষ্টা বৃথা হয়েছে। এই ঝড়ের শক্তি যেন অতিপ্রাকৃতিক, অদম্য গতিতে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে সর্বস্ব।

বিহ্বল চোখে ইরো দেখল কি সব যেন প্রবাহিত হয়ে চলেছে ওদের সাথে। উপবৃত্তাকারে প্যাঁচ খেয়ে বেগুনিয়াভ আলোর বিচ্ছুরণ নিমেষে বিলুপ্ত হচ্ছে আরো প্রগাঢ় কৃষ্ণকায় মহাশুন্যে। আকর্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছে তাদের বেলুনকেও সেই পথে। তাপমাত্রাও যেন অন্যরকম, হাওয়ায় ঈষৎ বৈদ্যুতিক ছোঁওয়া। কি ভাবে যেন ইরোর মনে হয়, ওরা স্থান-কাল পেরিয়ে অন্য মাত্রার স্থান-কালে পাড়ি দিচ্ছে। নীচে কোথায় পৃথিবী? অতল তলানিতে আর যাই থাক, ভূগর্ভ আছে বলে মনে হল না। এ যে মহাশুন্যে ভেসে যাচ্ছে ওরা!

‘আমরা কোথায় চলেছি মামু?’ ভয়ার্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করে ইরো, তবে অবাক কান্ড, কণ্ঠস্বর পৌঁছোয়না। মামু আর লুবরে হাতের কাছে থেকেও যেন নিশ্ছিদ্র কোন তরঙ্গ ওদেরকে একে অপরের থেকে আলাদা করে রেখেছে।

আচমকাই সামনে আসে উল্কাগতিতে এক আলোর ঝলসানি। বহু আলোকবর্ষ দুরে, কোন তারার ধ্বংসাবশেষ শেষবারের মতন ঝলসে ওঠে। সেই পরাবাস্তবতায় স্থানান্তরিত হয়ে এসে পড়ে ওরা এক সম্পূর্ণ নতুন জগতে। ইরো তাকিয়ে দেখে, শনির বলয়ের মতনই সুবৃহৎ সাতটা বলয়ে বেষ্টিত এই গ্রহ। এখানকার সূর্যের আলো বড়ই নিষ্প্রভ। শেষ বিকেলের মতন দিগন্তছোঁয়া হয়ে লেগে আছে আকাশে। হালকা বেগুনি এই আকাশের রং। বাতাস অত্যন্ত ভারী, শিথিল হয়ে আসে বেলুনের গতি সেই বাতাসে। ধীরে ধীরে এসে নামে এক ফাঁকা মরুভূমিতে। ওরা নেমে পড়ে বেলুন থেকে।

‘এ আমরা কোথায় এসে পড়লাম লুবরে? একেবারে বিশ্বের বাইরে? আমাদের কম্পাসে তো এমন কিছু নির্ধারণ করা ছিল না!’ মামুর চিন্তিত কণ্ঠস্বর।

‘না বয়েস্, তা ছিল না, তবে এমন কিছু এসে পড়েছে আমাদের গতিপথে, যা আমাদের কম্পাসের দ্বারা স্থিরীকৃত নির্দেশ অতিক্রম করে টেনে নিয়ে এসেছে তার নিজ শক্তিতে এখানে’

‘কি সেই অতিপ্রাকৃতিক বস্তু?’ খানিক নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন বয়েস্।

হঠাৎ ওনার খেয়াল হল, ইরো বেশ খানিকটা বালিয়াড়ি অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। তার গতিবিধি ওনাদের মতন এত ধীর নয়, সে প্রায় উড়ে চলেছে বাতাসের সাথে।

‘ইরো’ ডাক দিতেই কোঁকড়ানো চুলের বালকটা পিছনে ফিরে তাকালো।

‘কি হল ইরো? কিছু দেখেছো?’ জিজ্ঞাসা করেন উনি।

‘মামু, এই জায়গাটা আমার খুব চেনা লাগছে… আমি নিশ্চিত এখানে আমি আগেও এসেছি‘

‘এ তো এক অন্য স্থান-কাল ইরো, এক সম্পূর্ণ অন্য জগৎ, আমাদের সৌরজগৎ পেরিয়ে, আমাদের আকাশগঙ্গা পেরিয়ে এক সম্পূর্ণ পৃথক বিশ্বলোক মনে হচ্ছে! তোমার এখানে এর আগে আসা অসম্ভব।’

‘এই দেখো মামু, এই প্রত্যেকটা বালুকণার মধ্যস্থলে কেমন ধুকুপাকু বেগুনি আলো জ্বলছে দেখছো? এরা প্রত্যেকে জীবন্ত! মনে হয় ঘুমোচ্ছে, ঘুম ভাঙলেই উঠে নিজস্ব আকার নেবে ওরা’

‘আমি তো কোন আলো দেখতে পাচ্ছি না’ লুবরে একমুঠো বালি হাতে ভরে পর্যবেক্ষন করতে লাগলেন, ‘আমার চোখে তো এগুলো শুধু কালচে-লাল বালি’

‘আমার দেখে তাই মনে হচ্ছে। তবে ইরো যখন বলছে…’ বললেন  বয়েস্ ‘দেখছেন তো ওর দেখাশোনা-চলাফেরা আমাদের থেকে কিছুটা এগিয়ে হচ্ছে। এই যেমন এখন, এতক্ষন পর আমি কিন্তু এই গ্রহে আবর্তমান আবছা বলয় দেখতে পাচ্ছি আকাশ জুড়ে। এটা আমাদের চোখে এর আগে দৃশ্যমান হয়নি’

‘আচ্ছা বয়েস্’ এবার খুব নীচু স্বরে বললেন লুবরে ‘এর আগে আমি-আপনি তো অনেক অভিযানেই গিয়েছিলাম, কিন্তু তার কোনটাতেই তো এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি! এমন নয়তো, যে ইরোর উপস্থিতিই কোন চৌম্বকীয় জাদুবলে এই অজানা পরিসরে টেনে নিয়ে এসেছে আমাদের?’

‘ইরো একটু আগেই বলেছিল বটে, যে এই জায়গাটা ওর খুব চেনা লাগছে’ বললেন বয়েস্।

ওনাদের কথার ছেদ ঘটলো ইরোর ডাকে।

‘মামু, মিঃ লুবরে, দেখুন আমি কি পেয়েছি!’

দৌড়ে গিয়ে ওরা দেখলো একটা জলাশয়ের পাড়ে কতগুলো ছোট ছোট নুড়িপাথর। অদ্ভুত তাদের আকৃতি। কোন জ্যামিতিক বিবরণের মধ্যে তাদেরকে বোঝানো মুশকিল। পদার্থগুলো যেন নুড়িপাথর হয়েও বাষ্পে ভেসে বেড়াচ্ছে, ক্ষীণ আলোর রেখায় পরিবেষ্টিত।

‘এদের সাথে আলাপ হল মামু’

‘এরা তো নুড়ি, জড়বস্তু মাত্র!’

‘না এই দেখো, কথা বলছে’

মন দিয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল সকলে। সত্যি তো, কি যেন একটা আওয়াজ একটানা তরঙ্গায়িত হয়ে বেরোচ্ছে এদের থেকে, যেন কোন দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে।

‘আমি তো এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছি না বয়েস্। আমার চিন্তা আমরা এখান থেকে স্বস্থানে ফিরবো কিভাবে?’ বললেন মিঃ লুবরে।

‘এরাই এই গ্রহের অধিবাসী। আমি কথা বলছি এদের সাথে’ বলল ইরো।

হো-হো করে হেসে উঠলেন লুবরে।

‘জড়বস্তু আবার অধিবাসীও হয়? এমন আজব কথা আমি জীবনে শুনিনি!’

হঠাৎ এক কালান্তিক ঘূর্ণবায়ুর আবির্ভাব হয় গ্রহের অন্তঃস্থল ভেদ করে। ইরো দেখতে পায় শত-সহস্র নুড়িপাথরের ভেতরের আলো সেই ঘুর্নিঝড়ে জাগ্রত হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এসবের কিছুই ওর মামু অথবা লুবরে টের পায়না, তারা নির্বিকারভাবেই কোন গুরুগম্ভীর আলোচনায় মত্ত। এমন সময়, সেই স্বপ্নে-জাগরণে দেখা তীব্র একঝলক আলো খেলে যায় ইরোর চোখের সামনে। ইরো বোঝে এই গ্রহে ওর সাথে মামুরা থাকলেও, ও এক্কেবারে একা, এদের সম্মুখীন হতে হবে ওকে নিজেকেই।

সেই আলোর রশ্মি আসে ওই সম্মিলিত সহস্র নুড়িপাথরের প্রাণবিন্দু থেকে। এক বৈদ্যুতিক শক্তি দিয়ে ওরা জানান দেয় ইরোকে যে ওরাই ছোটবেলা থেকে ওকে ডেকে এসেছে, ওরাই এই অনন্ত বহু-ব্রহ্মান্ডের বার্তাবাহী। যখন যে লক্ষ্যে ওদেরকে বার্তা পৌঁছাতে বলা হয় অথবা নজরদারি করতে হয়, তখনি ওরা পৌঁছে যায় সেখানে। এক ঝলকেই সমস্ত তথ্য জোগাড় করে ফিরে যায় নিজস্ব সূত্রে।

‘তোমার গ্রহের সময় অনুযায়ী দশ-বছর সম্পন্ন হয়েছে তোমার, আজ তাই তোমাকে ডেকে আনা হয়েছে এখানে। এতদিন আমরা প্রচ্ছন্নে তোমার অভিভাবকত্ব করেছি। আজ তোমার ডাক এসেছে ওই বন্ধ কারাগার থেকে উন্মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসার জন্য’

‘কি বলছ তোমরা? তোমরাই সে আলোর ঝলকানি যাদেরকে আমি মাঝেমধ্যেই দেখতে পেতাম?’

‘হ্যাঁ’

‘কিন্তু তোমাদের মধ্যে প্রাণ আছে কিভাবে? আমাদের পৃথিবীর বাসিন্দাদের স্বাভাবিক ইন্দ্রিয়ের মতন তোমাদের কোন ইন্দ্রিয়ই নেই, তোমরা যে নিছক ধূলিকণার সংকলন’

‘তোমাদের সংজ্ঞায়িত প্রত্যয় অনুযায়ী যাদের ইন্দ্রিয় আছে, তারাই কি জীবিত? আমরা তাহলে তার বহু ঊর্ধ্বে । তোমাদের চোখে আণুবীক্ষণিক হলেও, আমাদের মধ্যে আছে জটিল-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণবিন্দু। তোমাদের ইন্দ্রিয়ের মতন আমাদের ভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বর্ণিত নয়, তবু আমরা তোমাদের থেকে ঢের শক্তিশালী। আর যা তোমাদের কাছে হাজার-বর্ষ, এই জগতে সেটা এক-পলকও নয়। আমরা উল্কাগতিতে ধেয়ে চলতে পারি বহু-ব্রহ্মান্ডের এপার থেকে ওপার। আমাদের গতি অবারিত, আমাদের সময় অনির্ধারিত।’

বিহ্বল হয়ে শুনছিল ইরো এদের কথা। ও জানে, এই ধরণের প্রাণের কথা ওদের শান্ত নীল পৃথিবীতে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু কি এদের উদ্দেশ্য? নামিবিয়ার মরুপ্রদেশ দিয়ে উড়ে চলা বেলুনকে কেনই বা ওরা টেনে নিয়ে এনে ফেলল এখানে? কেনই বা ওরা নিঃশব্দে অভিভাবকত্ব করত ওকে?

দপ্‌দপ্‌ করে জ্বলতে থাকা আলোর রশ্মি যেন ঠিক ওর মনের কথা শুনতে পেয়ে ওকে জানান দিল  

‘মনে পড়ে প্রথম কবে আমাদের দেখেছিলে?’

অনেক ভেবেও ইরো মনে করতে পারলো না। ও তো প্রায়শই দেখে এই আলো, কবে শুরু হয়েছিল, তা ওর স্মৃতিতে ছিলনা।

‘মনে আছে তুমি তোমার বাবা-মায়ের সাথে গাড়ি করে বেড়াতে গিয়েছিল? সেদিন সন্ধ্যায় ধেয়ে এসেছিলো তোমাদের কাছে এমনই এক আলো’

চকিতে খেয়াল হয় ইরোর, তাইতো! সেই আবছা স্মৃতিতেই তো প্রথম এই আলোর হদিশ পেয়েছিল। তারপর থেকে সেই আলোই কি ঘুরে ফিরে আসে তবে? ওর বাবা-মাকে ওর থেকে কেড়ে নিয়ে, এবার কি ওকে নিতে এসেছে এরা? তারপর আবার বোধোদয় হয়, তাই যদি হবে, তবে এত বছর ধরে ওর রক্ষক হয়ে থাকবে কেন?

ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সেই আলো তরঙ্গায়িত হয় আবার, জ্বলন্ত নিভন্ত শত-সহস্র আলোকবিন্দু যেন এক মনে চেয়ে থাকে ইরোর গভীর কালো মণির ভেতর। তারপর বলে

‘তোমার বাবা-মা আমাদের রক্ষা করতে বলেছেন তোমাকে। ওনাদেরকে যখন আকস্মিকভাবে পাড়ি দিতে হয় এই জগতে, তখন তুমি একেবারেই শিশু। বহুমাত্রা অতিক্রম করে স্থান-কাল যাত্রা সহ্য করতে পারতে না। তাই ওনারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেয়েও, তোমাকে সাথে নিয়ে আসতে পারেননি। তোমার বৈজ্ঞানিক বাবা-মা তোমাকে তোমার সবথেকে সুরক্ষিত স্থানে - তোমার মামুর তত্ত্বাবধানে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তারপর। আজ এতো বছর পর তাদের আহ্বানেই তুমি এখানে এসেছ সব সীমানা পেরিয়ে’

‘আমার বাবা-মা বেঁচে আছেন? কোথায় ওনারা? কি এমন দরকার পড়েছিল যে আমাকে ছাড়াই ওনাদেরকে পাড়ি দিতে হলো বহির্জগতে?’

‘ওনারা অনেক বৃহৎ চমত্কারিত্বের খোঁজে পাড়ি দিয়েছিলেন সেদিন… যেমন হঠাৎই আজ তোমার ডাক এল, সেই ডাক কি উপেক্ষা করতে পারলে তুমি? তেমনি ওনাদের ডাককেও ওনারা উপেক্ষা করতে পারেননি’

‘কোথায় আমার বাবা-মা?’

সহসা বেগুনিয়াভ দিগন্তের দিকে চোখ পড়লো ইরোর। বহুদূরের আকাশে জাজ্বল্যমান অজস্র সুড়ঙ্গপথ, হাতছানি দিচ্ছে ওকে।

‘তোমার বাবা-মা এই গ্রহে ছিলেন কয়েক শতবর্ষ আগে। আরো বৃহত্তর কাজের কারণে পাড়ি দিয়েছেন এখন অন্যত্র। ওই সুড়ঙ্গপথেরা অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্য। স্থান-কাল-মাত্রা পারাপার করে নিয়ে যাবে সঠিক গন্ত্যবে। তবে রাস্তা অজানা, সেটা তোমাকেই বুদ্ধি করে খুঁজে বের করতে হবে। তুমি নিজেই নিজের পথপ্রদর্শক হয়ে বেলুনকে চালিত করবে সঠিক জগতে’

ঘূর্ণিঝড় ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। মিশে যায় মাটিতে, নির্বাপিত হয় সহস্র আলোকবিন্দু।

চমক ভাঙ্গে ইরোর। সবিস্তারে মামুদেরকে সবটা বলে। এক স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে ওর মামুর মুখে। সে হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ওনার চোখের মনিও। যে সম্ভাব্য প্রাণসংশয়মূলক গবেষণার জন্য উনি ওনার দিদি-জামাইবাবুর সাথে একত্রিত হয়ে লেগে পড়েছিলেন, তা সাফল্যের পথে এগোচ্ছে! হারিয়ে যায়নি ওরা নশ্বর নক্ষত্রমণ্ডলীতে। স্থান-কাল ভেদ করে, বহুবিধ জীবন খুঁজে বের করার চাবিকাঠি ওদের জানা হয়ে গেছে তাহলে, জানা হয়ে গেছে বহু-ব্ৰহ্মাণ্ড পাড়ি দেওয়ার রহস্য! আবার সবাই পুনর্মিলিত হয়ে সেই গবেষণা পুনারম্ভ করার মাধ্যম এখন ওনাদের সকলের প্রাণকেন্দ্র, ওনাদের ইরো। একমাত্র সেই এই অতি-চৌম্বকীয় আকর্ষণে, নিজের অজান্তেই পথপ্রদর্শক হয়ে পারাপারের নাবিক হয়ে উঠেছে।

ওরা এগিয়ে চলল বেলুনের দিকে, ইরোর উদ্গ্রীব চাহনি ওই বেগুনি আকাশে বিরাজমান কৃষ্ণগহ্বর-রূপ সুড়ঙ্গপথের দিকে। সঠিক পথের দিশা ওকে খুঁজে বের করতেই হবে, ওর বাবা মায়ের কাছে পৌঁছতেই হবে! এগিয়ে চলে হট-এয়ার-বেলুন সেই অন্ধকূপে, নতুন নক্ষত্রপুঞ্জের সন্ধানে।

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb