কুম্ভকর্ণ

লেখক - ড. জয়শ্রী পট্টনায়ক

 

দিনের শেষে পরিশ্রান্ত সালিম আলি নিশ্চুপ বসে আছে ঘরের দাওয়ায়। কানে আসছে রাবেয়া বিবির ক্লান্ত স্বর----ছেলের ঘুম ভাঙানোর ব্যর্থ চেষ্টা।    

“ও হাসান বাপ, ওঠ বাপ আমার,  আর কত ঘুমাবি?”       

দুরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দুঃখী পিতৃ হৃদয় বিড়বিড় করে ওঠে অজান্তে......               

“ আল্লা, এই গরিবের ঘরে কি বিপত্তি পাঠালে? সুখে দুঃখে বেশ তো ছিলাম আমরা। ছোট্ট হাসানের দুষ্টুমি আর আবোল তাবোল কথায় আমাদের কুঁড়েঘর ভরে থাকতো সবসময়। সেই কোন সকালে পান্তা খেয়ে দিন মজুরের কাজ করতে বেরিয়ে যেতাম। হাসান ও ক্ষুদে ক্ষুদে হাতে বই খাতা সামলে গ্রামের পাঠশালায় যেত।  আমার বাড়ি ফেরার আগেই রাবেয়া  কাঠকুঠো জ্বেলে রান্না চড়াত আর হাসান পাঠশালা থেকে ফিরে ছুটোছুটি আর হাঁসি কান্নায় ঘর মাতিয়ে রাখত। আমি কাজের শেষে দাওয়ায় তামাক খেতে খেতে তোমার মেহেরবানী তে যেন এক টুকরো জন্নত দেখতে পেতাম আমাদের সংসারে।  ঘরে হাজার অভাব থাকলেও শান্তিতে ছিলাম আমরা তিনজন।  কেন আমাদের এমন দিন দেখালে আল্লা?”                   

সকাল থেকে রাবেয়া বিবি ছেলেকে একটানা ডেকে যাচ্ছে কিন্তু হাসানের ঘুম ভাঙ্গতেই চায়  না। কুম্ভকর্ণকেও ঘুমে টেক্কা দেয় হাসান! রামায়ণের সে বীর বছরে ছ’মাস ঘুমিয়ে কাটাতেন আর এ দিকে বর্ধমানের পিংলা গ্রামের হাসান একবার বিছানায় পড়লে ২০-২৫ দিনের আগে সে ঘুম ভাঙায় কার সাধ্যি। সব মিলিয়ে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে কমবেশি ৩০০ দিনই ঘুমিয়ে থাকে সে।  সারাদিনের অমানুষিক কাজের পরিশ্রমে আজকাল যেন রাবেয়ার শরীর ভেঙ্গে পড়তে চায়। সংসারের হ্যাপা সামলে গ্রামের বাবুদের ঘরগোয়াল সাফসুতরোর কাজ নিয়েছে সে। উপায় নেই, একমাত্র  সন্তানের এমন অদ্ভুত রোগ।  চিকিৎসার খরচ অনেক। সেই খরচ সামলাতে সালিম আলিকেও আজকাল দিন মজুরের কাজের পর বাবুদের চালের মিলে অনেক রাত পর্যন্ত খাটতে হয়। এত খাটাখাটনির পর বাড়ি ফিরে ছেলের ঘুমন্ত মুখ দেখে তাদের দুজনের ক্লান্তি যেন আরও বেড়ে যায়।  আজ প্রায় দু বছর হয়ে গেল হাসানের চিকিৎসা চলছে। দশ বছর বয়সে ঘুমনো রোগ ধরা পড়ার পর স্বাভাবিক জীবন প্রায় ভুলতেই বসেছে ছেলেটা।  ঝাড়ফুঁক, টোটকা, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি এলোপ্যাথি ......... সব মিলিয়ে ওষুধ খেয়েছে বিস্তর। কিন্তু রোগ তো সারেইনি উপরন্তু বেড়েছে। প্রথম দিকে একটানা ৫ থেকে ১০ দিন ঘুমোত। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দিন। এখন তো  একবার ঘুমালে ২০ থেকে ২৫ দিনের আগে ভাঙানো যায় না সে ঘুম।’’ এক্কেবারে গোড়ায় ধরা পড়লেও  রোগটি সারার সম্ভাবনা কতটা তা নিশ্চিত করতে পারছেন না বর্ধমানের বড় সরকারি হাঁসপাতালের চিকিৎসকেরা।   ডাক্তারি পরিভাষায় -------  

এই রোগের নাম অ্যাক্সিস হাইপারসমনিয়া।  এটা  আদতে এক স্নায়ুর রোগ। মস্তিকে টিএনএফ-আলফা নামে এক প্রকার প্রোটিনের মাত্রা ওঠাপড়ার কারণে এই রোগ হয়।

 সালিম আর রাবেয়ার মাথায় ডাক্তারি ভাষা প্রায় কিছু ঢোকে না। শুধু এটুকু বোঝে যে এই সব্বনেশে ঘুমরোগের জ্বালায় স্বাভাবিক জীবন শিকেয় উঠেছে তাদের এক মাত্র সন্তানের। মাসের মধ্যে সাকুল্যে পাঁচ-ছ’দিন পাঠশালায় যেতে পারে সে। গ্রামের সকলে এক ডাকে চেনে হাসানকে-- কুম্ভকর্ণ নামে।  সবাই জানে একবার ঘুম পেয়ে গেল, তো যেখানে রয়েছে সেখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে । ব্যাস, তার পরে ২০-২৫ দিন ওকে জাগানো যায় না । তখন স্নান করানো, খাওয়ানো সহ সব দায়িত্ব বাড়ির লোকজনের।  অনেক সময় পাঠশালাতেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।  তখন আবার বাড়ির লোকের আর এক ঝক্কি।    

-“ডাক্তারবাবু , কেন এমন লম্বা ঘুম?”   

রাবেয়া বিবি আর সালিম আলির বার বার এই আকুল প্রশ্নে বিব্রত ডাক্তারবাবুরা সহজ ভাষায় তাদের বোঝাবার চেষ্টা করেন………   

-“হাসানের এই ঘুমরোগ খুবই জটিল। খেলতে খেলতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগলে বা অতীতে মাথায় টিউমার থাকলে পরে অনেক সময় এই রকম অবস্থা হতে পারে। ডাক্তারি শাস্ত্রে একে মানসিক সমস্যা বলে মনে করা হয়। এটা স্নায়ুর রোগ । তবে সবাই এমন লম্বা ঘুমোয় না। কেউ কেউ অনিদ্রায় ভোগে আবার কারো রাতে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম হয় ও সারাদিন ঘুমঘুম ভাব থাকে।  

-“এই রোগ সারবে তো ডাক্তারবাবু”

অসহায় দম্পতির এই ব্যাকুলতায় চিকিৎসকরা বলেন--     

_” বয়সের সাথে সাথে ঘুম কমতে পারে । কিন্তু তার জন্য ওষুধ খাওয়ানোর সাথে সাথে ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। দিনের বেলা যতটা সম্ভব জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে কিন্তু রাত জাগা চলবে না। রাতে শান্তিতে ঘুমোতে দিতে হবে। শরীর ভালো রাখার জন্য সময়ে নাওয়া খাওয়া ও খেলাধুলো করা দরকার। তবে কোন নেশার জিনিষ এমনকি চা ও খাওয়া চলবে না কারণ তাতে ঘুমে বিঘ্ন হতে পারে। এভাবে অনিয়মিত ঘুমনো কমে গেলে এই রোগ ধীরে ধীরে সেরে যাবে.........”।          

তারপর থেকেই রাবেয়া অক্লান্ত ভাবে ছেলেকে জাগানোর চেষ্টা করে সারাদিন।   

“ও হাসান, ওঠ বা আ আ আ আ প আমার .........”     

ঘুমঘুম ভাব, দিনভর ক্লান্তি আর মাথাব্যথা নিয়ে মাঝে মাঝে আম্মির ডাকে হাসান জেগে ওঠে। চেষ্টা করে আর সবার মত পাঠশালা যেতে, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলো করতে। কিন্তু অসহ্য ক্লান্তি তে কোন কিছুতেই মন বসাতে পারে না। কখনও কখনও পাড়া প্রতিবেশী বন্ধু বান্ধব দের তার উদ্দেশ্যে বলা কিছু কথা কানে আসে--     

-” হেঁহেঁ বাবা বড় কঠিন রোগ! ----- ওর কুম্ভকর্ণের ঘুম রোগ হয়েছে।”          

  ওদের কথা শুনে চোখে ভেসে ওঠে গ্রামের স্কুলের মাঠে দশেরা মেলায় রামলীলা যাত্রাপালায় দেখা কুম্ভকর্ণের কথা। তবে কি কুম্ভকর্ণের ও এই রোগ ছিল?  হাজার ঢাক ঢোল বাজিয়েও তার ঘুম ভাঙ্গানো যেত না। যাত্রাপালায় পেটমোটা কুম্ভকর্ণের কাঁসর বাদ্দ্যি বাজিয়ে ঘুম ভাঙানোর দৃশ্যটা মনে পড়তেই হাঁসি তে পেট টা গুড়গুড়িয়ে ওঠে বারো বছরের কিশোরের ।   

রাতে শুতে এসে ঘুমন্ত ছেলের মুখে হাঁসি দেখে যেন বুকে বল খুঁজে পায় মা বাবা। সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে এক নজরে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময়ে ঘুমে ঢলে পড়ে দুজনে। হাসানের সেরে ওঠার আশা কেউ দেখাতে না পারলেও রাতভর ছেলের ঘুম ভাঙার স্বপ্ন দেখে তারা।

 

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb