উষ্ণায়ন এবং নকা মামা ও ডারউইন

লেখক - ডঃ দীপঙ্কর বসু

অক্টোবরের ১০ তারিখ।  দুর্গা পূজোর আগের শেষ রবিবারে প্রতি রবিবারের মতই আমাদের আসর বসেছে পরান দার চায়ের দোকান কাম রেস্টুরেন্টে। তবে গত একমাস ধরেই আমাদের  এই আসরে কোন প্রাণ নেই। থাকবেই বা কি করে! আসরের মধ্যমণি নকা মামারই যে পাত্তা নেই। সেই যে একমাস আগে নিরুদ্দিষ্টের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন তারপর সেই তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়ার সুযোগ এখনও আমাদের তিনি দেন নি। না, বৌদি বা আমরা কেউই থানা পুলিশ করি নি কেননা হামেশাই তিনি এই কান্ড ঘটান। আসলে অভ্যাস হিসাবে এটি ওনার মস্তিষ্কের নিউরনের অন্তর্জালে ঢুকে গেছে। আর নকা মামা না থাকলে যা হয়, আসরের মজাটাই উধাও। আলোচনাও সেই থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর।

সেদিনের আসরেও গোবিন্দ বাবু, অমল ত্রিপাঠি, অপূর্ব বাবু, দেবাশীস বাবু, সমীরণ বাবু, মহিলা সদস্যা  থিটা সবাই হাজির।কথায় কথায় সমীরণ বাবু বললেন , “ পূজোর মাত্র একদিন বাকি, কিন্তু গরম বা বৃষ্টি কোনোটারই দাপট কমার কোন লক্ষণ দেখা যাছে না।”
 
“হবে না? আরও কাটুন গাছপালা! উষ্ণায়নের দাপটে পৃথিবী এবার শেষ হয়ে যাবে”, বললেন গোবিন্দ বাবু ।

উষ্ণায়ন নিয়ে কথা হবে আর বিজ্ঞানের শিক্ষক অপূর্ব বাবু কিছু বলবেন না, তা তো হতে পারে না। তিনিও মুখ খুললেন,

“আর বলবেন না, মানুষের এই লাগামছাড়া তেল আর কয়লা পোড়ানোর জন্যই তো আগের শতকে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট বেড়ে গেছে”,বললেন অপূর্ব বাবু।              
 নিরীহ গোছের মানুষ ব্যাংক কর্মচারী সমীরণ বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা,তেল আর কয়লা পোড়ালে তাপমাত্রা কেন বাড়ে?”                                                                                                         
নকা মামার অনুপস্থিতিতে বিজ্ঞানের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে অপূর্ব বাবু বললেন, “ তেল,কয়লা জ্বালালে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়। সূর্যের আলো এই কার্বন ডাই অক্সাইডের মধ্যে দিয়ে এসে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে। এতে তৈরি হয় ইনফ্রারেড বিকিরণ। এই বিকিরণ সহজে কার্বন ডাই অক্সাইডের মধ্য দিয়ে আকাশে ফিরে যেতে পারে না। আর এর ফলেই বেড়ে যায় পৃথিবীর তাপমাত্রা।”

কর্পোরেট ম্যানেজার থিটার আবার সব তথ্য নখদর্পণে। তিনি উজাড় করে দিলেন তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার। “শিল্প বিপ্লবের আগে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের গড় পরিমাণ ছিল ২৭০ পিপিএম। এখন এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮৭পিপিএম। ১৯০০ সালে তেল খরচা হয়েছিল ১৫০ মিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমানে তা ১৮৫ গুণ বেড়ে হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ব্যারেল।”

 এখানে আবার কথার খেই ধরে নিলেন অপূর্ব বাবু।                 

 “২০০৮ সালে জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে বাতাসে ৯.৪ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে পরে। এর মধ্যে ৫ বিলিয়ন টন সমুদ্র, মাটি আর উদ্ভিদের মধ্যে আবার ফিরে যায়। বাকি কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে যায় বাতাসে আর বাড়িয়ে দেয় পৃথিবীর তাপমাত্রা।” এইভাবে খানিকক্ষণ উষ্ণায়ন নিয়ে তথ্য আর কথার নানা কচকচি হলেও নকা মামার অনুপস্থিতিতে আসর কিছুতেই জমছে না। নতুন কিছুর অভাবে আলোচনাও হয়ে যাচ্ছে ম্যাড়ম্যাড়ে। অন্যদিকে মানুষের বিস্তর হঠকারী কাজে মুখভার করে আছে প্রকৃতিও। আর তা জানান দিচ্ছে শরতের আকাশে গুরু গম্ভীর  মিশকালো মেঘের  উপস্থিতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল প্রকৃতি। শুরু হল প্রবল বৃষ্টি। হঠাৎই ঐ প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় আধা ভেজা অবস্থায় আগমন হল নকা মামার!
এসেই  সকলের জন্য চা আর মাটন কাটলেটের অর্ডার দিয়ে ছাতাটা কোনার দিকে রেখে এসে বসলেন আসরে। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে ভেজা হাত মুখ মুছতে মুছতে আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তা কি নিয়ে এত হৈ চৈ হচ্ছে?”                                     
আমি বললাম, “এই আবহাওয়ার উল্টোপাল্টা আচরণ, পৃথিবীর উষ্ণায়ন, ফসিল জ্বালানীর অতিরিক্ত ব্যবহার, বন নিধন এইসব নিয়ে। তা ছাড়ুন ঐসব। বলুন, আপনি হঠাৎ এতদিন  কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ?”
“সমাপতন বোধহয় একেই বলে। আমি গিয়েছিলাম হ্নডুরাস আর ঘানায় পৃথিবীর উষ্ণায়ন নিয়ে একটা কাজের জন্য হ্নডুরাসের বিজ্ঞানী ডঃ অলিভার পিট্টি আর ঘানার বিজ্ঞানী ডঃ ন্যাট সাইমন্সের আহ্বানে” ,বললেন নকা মামা। ক্লাই- ফাই অর্থাৎ ক্লাইমেট ফিকসনের গন্ধ পেয়ে অপূর্ব বাবু আর থিটা একেবারে লাফিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে একসঙ্গে  নকা মামাকে বললেন, “শিগগিরি, শুরু করুন মামা। উপোসী আসরকে আর  অপেক্ষা করাবেন না।”    

শুরু করলেন  নকা মামা।
“দিনটা ছিল ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসের কোন একটা দিন। তারিখটা ঠিক মনে নেই। রাতে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ কে আমার হাত ধরে দেখি টানছে। তাকালাম। দেখি, উজ্জ্বল দুই চোখ আর সফেদ দাড়িগোঁফবিশিষ্ট সুদর্শন চেহারার এক বৃদ্ধ। বললেন, ‘আমি চার্লস, মানে চার্লস ডারউইন। আমরা ব্রাজিলের আমাজনের জঙ্গল আর অ্যান্ডিজ পাহাড়ে যাচ্ছি। প্রকৃতির বৈচিত্রময় প্রাণী আর উদ্ভিদ দেখতে চাইলে তুমি আমাদের এই যাত্রার সঙ্গী হতে পারো। চললাম, জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী ডারউইনের সঙ্গে ‘বীগল’ জাহাজে চড়ে অজানা পাহাড় আর জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। চলতে চলতে সমুদ্রপথের নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে  অবশেষে পৌঁছলাম আমাজনের জঙ্গলে। আসার পথে ‘কেপ ভার্দে’ দ্বীপ আর দক্ষিণ আমেরিকার আর কয়েকটি অঞ্চল অতিক্রম করেছি।

জঙ্গলের যেখানে পৌঁছলাম সেখানে নদীটা প্রায় দু মাইল চওড়া। নদী বেশ গভীরও। এখানে  সেখানে ঘূর্ণির সঙ্গে আছে দুরন্ত স্রোত।নরম মাটি আর পচা পাতায় ভরা মাটিতে বিশাল উঁচু উঁচু গাছের এক ঘন জঙ্গল। নীচ থেকে যেমন সূর্যের আলো দেখা যায় না তেমনই নীচেও পৌঁছয় না সূর্যের কোন আলো। বেঁচে থাকার জন্য সূর্যের এতটুকু আলো পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে করতে অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে গাছগুলো।আর এই গাছেদের দৌলতে চারিদিকে দিনের বেলাতেও সাঁঝবেলার আলোআঁধারি। মনে হয় অন্য কোন গ্রহে হঠাৎ এসে পড়েছি।  ভেঙে পড়া গাছের গুঁড়িগুলোতে ঘন সবুজ শ্যাওলা আর উজ্জ্বল লাল ব্যাঙের ছাতা। উঁচু গাছগুলির ক্যানোপি থেকে ঝুলছ্রে প্যাঁচানো সব লতার জট। ১০০ ফুটের বেশী উঁচুতে এই ক্যানোপি অর্থাৎ শামিয়ানাগুলো আসলে তৈরি বিভিন্ন জড়ানো শাখা প্রশাখা এবং বৃক্ষপত্র দিয়ে।তাতেই জড়িয়ে আছে ব্রোমেলিয়াডস। এই ব্রোমেলিয়াডস প্রায়শই এপিফাইটসের মত পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ। ব্রোমেলিয়াডসগুলো দেখতে অনেকটা পেয়ালার মত। আমাজনের রেইনফরেস্টের এই পেয়ালাগুলোতে জমা হয় বৃষ্টির জল আর উড়ে আসা কাঁকড়,বালি আর ধুলোর মত রাবিশ।চারদিকে দেখলে গা ছমছম করে।ভূতের গল্পে যে গা ছমছমের কথা লেখা থাকে এটা তেমন নকল গা ছমছম নয়। একেবারে আসল অনুভূতি।

 যাই হোক জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা চলার পর দেখি আমাজনের তীরের কাদায় বসে ঝাঁক ঝাঁক নানা রঙের বিভিন্ন রকমের প্রজাপতি।চারিদিকে যে ঘন জঙ্গলের আবরণ দেখতে পাচ্ছি তা আসলে বিভিন্ন লতা আর নানা ধরণের পুষ্প লতার জঙ্গল। যত এগোচ্ছি অবাক হয়ে দেখছি চারিদিকে বিশালাকার নানা প্রজাতির উঁচু উঁচু গাছ।মেহেন্দি,তাল, বাবলা, দেবদারু, কোকো।এছাড়াও নানা ধরণের অসংখ্য গাছ। চার্লস এক ধরণের বিশাল গাছ দেখিয়ে বললেন, “চেনো এই গাছ?” আমি না বলায় চার্লস বলল, “এটি ক্যাপক গাছ। আর ওগুলো হল লতানো অ্যারয়েডস। দূরে ঐ যে বড় গাছটা দেখছ ওটা হল রাবার গাছ।” বিমোহিতের মত দেখতে লাগলাম প্রকৃতির সৃষ্টি অনুপম সেই উদ্ভিদ বৈচিত্র। এর সঙ্গে চারিদিক ছেয়ে আছে এক অদ্ভুত গন্ধে। চারিদিকের গাছপালার গন্ধ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর ক্ষয়ে যাওয়া উদ্ভিদ আর তার কাঠের গন্ধ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে সেই অদ্ভুত গন্ধ।এর সঙ্গে আছে নানা ধরণের পোকা মাকড়ের গুনগুন করার কনসার্ট। চারদিক থেকে আসছে পাখির কিচিরমিচির আর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। কিন্তু মজার ব্যাপার জঙ্গলের ঘন পাতার আড়ালে থাকায় প্রায় দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না কোন পাখিকে। হঠাৎই, এক তীব্র গগনভেদী গর্জন আমাকে ভয়ে সিঁটিয়ে দিল।সারা শরীর কাঁপতে লাগলো আমার আতংকে! ডারউইন আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, “ভয় পেয়ো না, এটা হাওলার বাঁদরের চিৎকার। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো আওয়াজের অধিকারী এই বিরাটাকার বাঁদররা সবাইকে সাবধান করছে তাদের এলাকায় প্রবেশ না করার জন্য।”
দূর থেকে ভেসে এল এক হ্রেষাধ্বনি। মনে হল এ যেন বাঁদরদের চীৎকারের প্রত্যুত্তর।একটু এগোতেই দেখলাম লাল ঝুঁটির কাঠঠোকরা পাখি। আরও দেখতে পেলাম সবুজ পাখার নীল আর হলুদ রঙের অপূর্ব সুন্দর একঝাঁক টিয়া পাখি।দূর থেকে ভেসে আসছে কোন এক জলপ্রপাতের আওয়াজ। চলার পথে দেখলাম লাল,হলুদ,নীল রঙের ছোট ছোট ফুল আর নানা রঙের নানা আকৃতির অর্কিডের মেলা।  দেখে আমি চার্লসকে বললাম, “আপনার ‘অন দি অরিজিন অফ স্পেসিস’ বইতে এই অর্কিডের পরাগায়ন প্রক্রিয়ার অনেক দুর্লভ পর্যবেক্ষণের কথা আমি পড়েছি।” মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল ডারউইনের মুখে। দেখতে পেলাম এই  পরাগের লোভেই হামিং বার্ডের আনাগোনা , গুঞ্জনরত মৌমাছিদের দেখলাম এই অর্কিডের কাছে উড়ে বেড়াতে।

পথে  দারুণ সুন্দর একটি ফুল দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। চার্লসের কাছে শুনলাম এর  নাম হেলিকনিয়া। কলাপাতার মত দেখতে পাতার গাছে ঝুলছে লাল বেণীর মত এই ফুল। দুপাশে হালকা হলুদের আভা। একটু দূরেই দেখলাম এক লাল পাপড়ির বেগুনী ফুল। নাম ফুকসিয়াস। ফুলটির মুখে বেরিয়ে আছে এক লম্বা সরু শলাকা। লাল, হলুদ, সবুজ,নীলের মিশেলে কলাপাতার মত দেখতে গ্রীণ চিকসও কিন্তু মোটেই কম আকর্ষণীয় নয়। বাতাসে এই সব ফুল গাছের আন্দোলন দেখে মনে হয় ওরা নেচে নেচে আমাদের স্বাগতম বলছে। ফুলের এই বর্ণচ্ছটা দেখলে মনে হয় স্বর্গে প্রবেশ করেছি। স্বপ্ন ভঙ্গ করে আচমকাই এল বৃষ্টি।                        

চার্লস বললেন, “এই বৃষ্টির স্পর্শ তুমি প্রায়ই পাবে। আর এই কারণেই এর নাম রেইন ফরেস্ট।” অসংখ্য পাতায় পড়া বৃষ্টির শব্দ, ওড়-পে্নডলা পাখির জলতরঙ্গের মত টুং টাং আওয়াজ,পচা পাতার আড়ালে থাকা উজ্জ্বল নীল,লাল,হলুদ, সবুজ বিষাক্ত ব্যাঙের সুর করা আওয়াজ মিলিয়ে বর্ষার যে প্রাকৃতিক পরিবেশ তা এককথায় অতুলনীয়।

কিছু সময় পরেই থেমে গেল বৃষ্টি। এগোতে থাকলাম খুব সন্তর্পণে। আদিম এই জঙ্গলে সুন্দর ফুল, পাখি, জঙ্গলের উদ্ভিদের বৈচিত্র  মনে যে সুখের অনুভূতি এনে দেয় তা এককথায় অবর্ণনীয়। তবে সেটাই সব নয়। জঙ্গলের ঘনত্ব, বিশালতা আর বিভিন্ন পশু, পাখিদের গর্জন, তাদের কান্নার আওয়াজ,হড়কাতে হড়কাতে চলার শব্দ, চলার সময়ের থাবার শব্দ, হিস হিস ধ্বনি আর ফিসফিস শব্দ যেমন হৃৎকম্প সৃষ্টি করে তেমনি শিরদাঁড়ায় শীতল প্রবাহ বইয়ে দেয়। সেটা যে কতটা ভয়ের তা একমাত্র অভিজ্ঞ মানুষেরাই জানেন। ডারউইনের অবশ্য এসবে ভ্রূক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে বিভিন্ন পশু, পাখি, ফুল আর উদ্ভিদ চিনিয়ে দেওয়া ছাড়া যেন ওঁর আর কোনও ব্যাপারেই চিন্তা নেই। কিছুটা এগোতেই দেখতে পেলাম উড়ন্ত বিরাট পাখাওয়ালা উজ্জ্বল নীল মর্ফ প্রজাপতিকে। চলতে চলতে আরও দেখলাম সাদা পাখনা, পালকহীন কাল মাথা আর উজ্জ্বল লাল গলার সবচেয়ে লম্বা উড়ন্ত পাখি জ্যাবিরুকে, এক মিটার লম্বা দু মিটার পাখনার রাজকীয় হারপি ঈগলকে। চার্লস পরিচয় করিয়ে দিলেন দর্শনে প্রাগৈতিহাসিক মাথায় ঝুঁটিওয়ালা সরীসৃপ পাখি হোয়াটজিনের সঙ্গে। দারুণ সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে একটি গাছের গুঁড়ির কাছে একটা ঢিবির কাছে যেতেই চার্লস একঝটকায় আমার হাত ধরে সরিয়ে আনলো। বললেন, “এই ঢিবি বুলেট পিঁপড়ের। এদের কামড়ে বিষ থাকায় প্রচন্ড যন্ত্রনা হয়। খুব সাবধানে চল। লক্ষ লক্ষ পোকামাকড়ের আবাসস্থল এই আমাজনের জঙ্গল। এদের মধ্যে ওয়ান্ডারিং স্পাইডার আর ট্যারান্টুলা খুবই সাঙ্ঘাতিক।”

একটু এগোনোর পরে প্রায় চল্লিশ মিটারের কাছাকাছি উঁচু একটি গাছ দেখিয়ে ডারউইন বললেন, “এই যে কছেই একটা শক্ত খোলার ফল ভর্তি বিরাট গাছ দেখছ, এটা হল ব্রাজিল নাট গাছ।” অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলাম ক্যানপির থেকেও উপরে ওঠা এই ব্রাজিল নাট গাছকে। চার্লসের কাছে জানলাম যে এর হলুদ ফুল আস্তে আস্তে পরিণত হয় ১২ থেকে ২৪ বীজের ফলে। বড় গোল কাঠের মত শুঁটিতে থাকে বাদামগুলি।জঙ্গলের মাটিতে পড়ে ফেটে গিয়ে বেরিয়ে আসে বাদাম। বিরাট উঁচু আরেকটি গাছ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। প্রায় পনেরো ষোলো তলা বাড়ির সমান উঁচু এই গাছগুলি। ডারউইনের কাছে নাম জেনেছিলাম হুইম্বা।
           
হঠাৎই ডারউইন আমাকে বললেন, “অনেক কিছু তো দেখলে।তা তোমার কাছে কি সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে মনে হল?” আমার মুখ থেকে চকিতে বেরিয়ে এলো-জীব আর উদ্ভিদের বৈচিত্র্য। আরেকটি জিনিস অদ্ভুত দেখছি। কোন জায়গাতেই কোন বিশেষ উদ্ভিদ গুচ্ছের জঙ্গল দেখতে পাই নি।সব জঙ্গলই অনেক প্রজাতির গাছের সমাহার।                                  

চার্লস আনন্দে বাচ্চার মত হাততালি দিতে দিতে বললেন,”দারুণ পর্যবেক্ষণ।গ্রীষ্মমণ্ডলের সমস্ত রেইনফরেস্টেই তুমি এটা দেখতে পাবে।এক হেক্টর জমিতে নিদেনপক্ষে ৪০ থেকে ১০০ প্রজাতির গাছের দেখা তুমি পাবে। এই যে দেখছ আমাজনের জঙ্গল, এখানে প্রায় আশি হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এর মধ্যে চল্লিশ হাজারের বেশি প্রজাতি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।আমাকে তুমি বলো, মানুষের হাতে কি কোন প্রযুক্তি আছে যার দ্বারা তারা জঙ্গলের গাছের মত বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ এবং জমা করতে পারবে?”

আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম-‘না।‘ চার্লস প্রিয় শিক্ষকের মত হাসি হাসি মুখ করে আমায় বললেন, “ তাহলেই দেখ, বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করতে বনাঞ্চল ধ্বংস নয়, বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে।মানুষ গত একশো বছরে অনেক বনাঞ্চল ধ্বংস করেছে।”

আমি সুযোগ পেয়ে বললাম, “না এখন চারিদিকে চারিদিকে গাছপালা লাগানোও হচ্ছে অনেক।”                

ডারউইন খানিকটা রেগে গিয়ে বললেন, “হুজুগের বশে তোমাদের এই হৈহৈ করে গাছ লাগানোর ফলে ভালোর থেকে খারাপ হচ্ছে বেশি। পরিবেশের বাস্তুবিদ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একারণেই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।১৫০ বছরেরও বেশি আগে ১৮৫৯ সালে আমার এক পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছিলাম তোমাদের আমার ‘অন দি অরিজিন অফ দি স্পেসিস’ বইয়ের চতুর্থ পরিচ্ছেদে। সেখানে ছিল অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ মিশিয়ে লাগালে সেই সব গাছ শক্তপোক্ত হয় এবং বেড়ে ওঠে অনেক তাড়াতাড়ি।বনাঞ্চলের সামগ্রিক ফলনের বৃদ্ধি হয়।এক দু রকম প্রজাতির গাছের বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। এসব তো তোমরা বিজ্ঞানীরা ভুলেই মেরে দিয়েছ। তোমাকে তাই চাক্ষুষ দেখাতে এখানে নিয়ে এলাম। মনে রেখো, বনজঙ্গল একটি জটিল যন্ত্রের মতই ,যা লক্ষ লক্ষ অংশের সমাহার।এই ধরণের মডেলে বন দু থেকে চারগুন শক্তিশালী হয় এবং এর ফলে এই বনের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের ক্ষমতাও বেড়ে যায় অনেকটা।”

হঠাৎ তোমাদের বৌদির ডাকে ভেঙে গেল ঘুম। বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনও হাওয়া। স্বপ্ন যে এমন মধুর হয় তা উপলব্ধি করলাম সেদিন। চায়ের কাপে চুমুকের জন্য থামলেন নকা মামা। সুযোগ পেয়ে গোবিন্দ বাবু, সাহিত্যের জগতে যাকে সবাই চেনে ঢোল গোবিন্দ নামে, তিনি মামাকে ঠেস দিয়ে বললেন, “এই ফাঁকে তাহলে বিনে পয়সায় বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের সঙ্গে আমাজনের জঙ্গলে ঘুরে এলেন!” মামা এই ঠেসকে আমলই দিলেন না।আজকে যেন উনি অন্য জগতে বিচরণ করছেন। চায়ের কাপে দুবার চুমুক দিয়ে আবার শুরু করলেন।       

“বলতে পারো, স্বপ্নের দৌলতে মহান বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের দেখানো পথে পেয়ে গেলাম বিশ্বের উষ্ণায়নের সমাধানের রাস্তা। ফোন করলাম হ্নডুরাসের বিজ্ঞানী ডঃ অলিভার পিট্টি আর ঘানার বিজ্ঞানী ডঃ ন্যাট সাইমন্সকে।জানালাম ডারউইনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যর বিষয়ে।

“বাইছ্যা বাইছ্যা অ্যাইসব দেশের বিজ্ঞানীদের ডাকোন ক্যান?” পরাণ দার জিজ্ঞাসায় গল্পের দফারফা হওয়ার আশঙ্কায় ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ওসব গল্পের শেষে জানতে পারবেন।”

আজ যেন মামা উদার। খেই ধরলেন, “আচ্ছা বলছি কেন? আসলে দক্ষিণ আমেরিকার হন্ডুরাস আর আফ্রিকার ঘানা এই দুটি দেশই ছিল বনাঞ্চলে ভরপুর দুটি দেশ। ১৯৯৬ সালে ডঃ পিট্টি আমাকে হ্নডুরাসে ব্যাপক বনাঞ্চল নিধনের কথা জানিয়েছিলেন এবং এব্যাপারে আমি কিছু সাহায্য করতে পারি কি না তা জানতে চেয়েছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি কিছুই করতে পারি নি সেদিন। ১৯৯৭ সাল নাগাদ ডঃ সাইমন্সও জানিয়েছিলেন ঘানায়  দারুণভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস করার কথা এবং এর ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। আমার কাছে ডারউইনের তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনে দুজনেই খুব উৎসাহের সঙ্গে তাঁদের সরকারের সঙ্গে অগ্রণী প্রকল্পের ব্যাপারে কথা বলবেন জানালেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এসে গিয়েছিল অগ্রণী প্রকল্পের সম্মতি।

গিয়েছিলাম দুই দেশেই ডারউইনের পর্যবেক্ষণ এবং তত্ত্বের ভিত্তিতে একটি করে বনাঞ্চল তৈরির লক্ষ্যে ! এবং পরবর্তীতে কি করতে হবে তা ডঃ পিট্টি এবং ডঃ সাইমন্স আর তাঁদের দলবলকে বুঝিয়ে দিতে। ”                                              

কৌতূহলী দেবাশীস বাবু বড়বড় চোখে জিজ্ঞাসা করলেন , “ একবার গাছ লাগিয়ে দেওয়ার পরে গাছ তো নিজে নিজেই বেড়ে উঠবে। তা হলে পরে আর কি কাজ? প্রতিদিন গাছে জল আর সার দিতে হয় না কি!”

হেসে ফেললেন নকা মামা। “ সে সব কিছু করতে হয় না। তবে নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মানুযায়ী অবিরাম লাগিয়ে যেতে হয় গাছ যাতে জঙ্গল ভরে ওঠে বিভিন্ন বয়সের গাছে।” গোবিন্দ বাবু  বললেন,  “ এসব ঝামেলার দরকার মশাই, একেবারে পুঁতে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।” আবারও মুচকি হেসে মামা বললেন, “ তা হলে একসঙ্গে সবগাছ বড় হলে আর কাঠ ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে সবগাছ কেটে ফেললে তো আবার ফাঁকা হয়ে যাবে বনাঞ্চল।” আমি বললাম, “ তা গাছ লাগানো তো কবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ এখন উধাও হয়ে গিয়েছিলেন কেন?”                 

“এতবছর বাদে ডঃ পিট্টি আর ডঃ সাইমন্সের  আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম অগ্রণী প্রকল্পের বনাঞ্চল দেখতে। দেখে মন ভরে গেছে। দুই বিজ্ঞানী জানালেন এই বনাঞ্চল কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ অনেক বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে দুটি অঞ্চলই কার্বন নেগেটিভ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই সাফল্যে খুশি দুই দেশের সরকার সারা দেশেরই এমন প্রোজেক্টের জন্য দুই বিজ্ঞানীকে পরিকল্পনা করতে বলায়  আমাকে ওঁদের সাহায্য করার জন্য এই দুমাস ওখানে থাকতে হয়েছিল। কেননা বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে আর জলবায়ুর পরিবর্তন রুখতে এই কাজ আমাদের করতেই হবে” বললেন নকা মামা। 

থিটা বললেন, “তাহলে মামা, স্বপ্ন কি সত্যি!” “জানি না। তবে স্বপ্ন যদি পৃথিবীর এক বড় সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত দেয় তবে তা অবশ্যই মধুর” ব্ললেন মামা। তারপর  আসরের গতি অন্যদিকে যেতে পারে দেখে উঠে আসর ছেড়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন নকা মামা। আজ কোনমতেই আমাজন জঙ্গলের আবেশ মন থেকে চলে যেতে দেবেন না তিনি। আমরাও খুশমনে সেইদিনের মত আড্ডায় ইতি টেনে যে যার বাড়ির পথ ধরলাম।

 

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb