তেজস্ক্রিয় মেয়ে

লেখক - ডঃ শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়



আমাদের দেশ ভারতবর্ষ যেমন ব্রিটিশের পদানত ছিল, উনবিংশ শতাব্দীর পোল্যান্ড‌কেও সেই রকম প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া আর রাশিয়ার তিন রাক্ষুসে সাম্রাজ্য তিনভাগ করে ছিঁড়ে খেয়েছিল। এখনকার স্বাধীন দেশ পোল্যান্ডের রাজধানীর নাম ওয়ার্শো। এই ওয়ার্শোতে তখন রাশিয়ার জারের শাসন চলছিল। পোল্যান্ডের অধিকাংশ মূল বাসিন্দা ভুলতে বসেছিলেন পোলিশ ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। ইস্কুলে, কলেজে এইসব শেখানো হচ্ছে, একবার যদি এই খবর কানে যেত রাশিয়ান শাসকের, তাহলে শিক্ষকের এবং তার সাথে পড়ুয়ার যে কি ভয়ানক অবস্থা হত, তা ভাষায় প্রকাশ করে বলা যাবে না। যাই হোক, তবু এই পরিস্থিতিতে খুব গোপনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পোলিশ ভাষা এবং ঐতিহ্য সযত্নে শিখিয়ে যাচ্ছিলেন হাইস্কুলের গণিত আর পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ভ্লাদিস্লাভ স্ক্লোদোস্কা আর তাঁর সঙ্গীতশিল্পী এবং পিয়ানো-শিক্ষিকা স্ত্রী ব্রোনিস্লাওয়া স্ক্লোদোস্কার মত কিছু সাহসী পোলিশ। স্ক্লোদোস্কাদের চার মেয়ে সোফি, হেলা, মান্যা, ব্রোন্যা আর এক ছেলে জোসেফ। এদের মধ্যে সবচাইতে বড় হচ্ছে সোফি আর সবচেয়ে ছোটো মান্যা। ১৮৬৭ সালের নভেম্বরের সাত তারিখে মান্যার জন্মের পরে, এতজন ছেলেমেয়েদের সময় দিতে মা ব্রোনিস্লাওয়াকে ছাড়তে হল ইস্কুলের চাকরি। ভাগ্যের এমনি পরিহাস, ভ্লাদিস্লাভের প্রতিবাদী পোলিশ ভাবমূর্তির কথা কেমন করে রাশিয়ার শাসকের কানে পৌঁছে গেল। ফলশ্রুতিতে আগের বেশি মাইনের উঁচু পদের চাকরি ছেড়ে তাঁকে কম মাইনের চাকরিতে ঢুকতে হল আর গোটা পরিবার সেইসাথে পড়ল নিদারুণ অর্থকষ্টে। বড় মেয়ে সোফি টাইফয়েডে ভুগে মারা গেল বছর তিনেক পরে। মা ব্রোনিস্লাওয়াকে ধরল যক্ষ্মা রোগে। তাঁকেও আর বাঁচানো গেল না। বড় মেয়ে চলে যাবার বছর দুয়েকের মধ্যে স্ত্রীকেও হারালেন ভ্লাদিস্লাভ স্ক্লোদোস্কা। তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে একা একা মানুষ করতে হবে তাঁকে। বড়‌ই কঠিন সেই লড়াই। বড়‌ই কঠিন সেই সময়।

 

বড় বোন আর মায়ের আচমকা মৃত্যু সবচাইতে বেশি আঘাত দিয়েছিল ছোট্ট মান্যার কচি মনটাকে। সানাটোরিয়ামে মা যখন মরণাপন্ন তখন সে বারবার প্রার্থনা করেছিল ঈশ্বরের কাছে। তবু ঈশ্বর যখন শুনলেন না, তখন থেকেই সে বুঝতে পারে যে এরকম কিছু হয় না। উপরে কেউ আকুতি শোনার জন্য বসে নেই আর সারাজীবন তাকে একাই লড়ে যেতে হবে। একলা বাবা আর তাঁর সব ছেলেমেয়েদের জীবন-সংগ্রামের সেই শুরু। হাল না ছাড়া, সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা সবাই লেখাপড়ায় যেন এ ওকে পাল্লা দেয়। সবচাইতে ছোটটি, মান্যা, হচ্ছে এদের মধ্যে সবচাইতে মেধাবী। আর সেইসঙ্গে রক্তের সূত্রে সে পেয়েছে দেশভক্তি আর পোলিশ জাত্যাভিমান। আঠারোশ একাশিতে যেদিন স্বৈরাচারী জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যা করলেন পোলিশ বিপ্লবী ছাত্রদল, সেদিনটা মান্যা তার প্রিয় বান্ধবী কাজিয়ার সাথে ক্লাসরুমে নেচেকুঁদে উদযাপন করেছিল। এর দু'বছর পরে ক্লাসে প্রথম হয়ে সোনার মেডেল নিয়ে ইস্কুলের শেষ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হল মান্যা। এখন তার বয়স পনেরো। লাগাতার শারীরিক আর মানসিক পরিশ্রমের ধকল স‌ইতে না পেরে মান্যা ইস্কুলের মধ্যেই একদিন অজ্ঞান হয়ে যায়। বাড়ির সবাই বিশেষ করে বাবা ভাবলেন, ওকে একবছর বিশ্রাম নিতে হবে। জীবনের অক্লান্ত দৌড়ে মান্যা সেই একবছর প্রথম আর শেষ বিশ্রাম পেয়েছিল।

ইস্কুলের পাঠ শেষ করে হেলা চেয়েছিল গানের জগতে যেতে। জোসেফ আর ব্রোন্যার পছন্দ ছিল চিকিৎসকের পেশা। জোসেফ ছেলে। ওয়ার্শো বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সহজেই সুযোগ পেয়ে গেছিল চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ্যক্রমে ভর্তির। মুশকিল ছিল ব্রোন্যার। আর ছোটো মান্যার ইচ্ছে ছিল পদার্থবিজ্ঞানী হবার। সে যে বাবার ল্যাবরেটরিতে ছোটোখাটো যন্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করত ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, তাও আবার বিজ্ঞানের? জারের রাশিয়ায় এ সব কল্পনাতীত ছিল। একমাত্র উপায় হচ্ছে ইউরোপের অন্য কোনো উন্নত স্বাধীন দেশে পালিয়ে গিয়ে সেখানে পড়াশোনা করা। সবচাইতে ভালো গন্তব্য ফরাসীদের দেশ। রাজধানী প্যারি। কিন্তু বাবার বয়স হয়েছে আর অত টাকাও তো নেই যে দুই বোনকে বিদেশে রেখে উঁচু ক্লাসের পড়াশোনার খরচ জোগাবেন।

কিছুদিন ওয়ার্শোতে ভ্রাম্যমাণ নাইট-ইস্কুলে পড়ে সময় কাটাল দুই বোন।‌ সেও কিন্তু জারের চোখে বেআইনি। কখনো এখানে কখনো ওখানে ক্লাস বসে। পাঠ্যক্রম মোটেই আধুনিক কিছু নয়। এই সব চলতে চলতে তারা ভেবে দেখল যে এভাবে ভালো কিছু হ‌ওয়া মুশকিল। সাহসী মান্যা বরাবর‌ই ছকের বাইরে গিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। সেইই প্রথম প্রস্তাবটা দিল দিদি ব্রোন্যাকে, 'দিদি তুই বরং একাই প্যারি র‌ওনা দে। গোড়ায় ওখানে থাকা আর খাওয়ার খরচ আমি তোকে জোগাব। তারপর তুই যখন নিজে কিছু টাকাপয়সার বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হবি, তখন সেই টাকা দিয়ে ওখানে গিয়ে পড়া শুরু করব আমি।'

ব্রোন্যা হয়ত বলল, 'পাগলের মত কথা বলিস না বোন! এরকম আবার হয় নাকি? তাছাড়া তুই এখানে ওয়ার্শোতে কি কাজ জোটাবি শুনি? এখানে যে কটা টুইশানি পড়াস তার টাকাতে তোর‌ই চলছে না, তার উপর এইসব আকাশকুসুম কল্পনা! ধুস্!'

কিন্তু মান্যা সে কথা শুনলে তো? ছোটো বোনের একরোখা জেদের কাছে বাবা কিংবা দিদির কোনো ওজর-আপত্তিই টিকলো না। একদিকে ব্রোন্যাকে যেমনি সে প্যারিতে মেডিক্যাল পড়তে ঠেলে পাঠাল তেমনি আরেকদিকে নিজে, সতের বছর বয়স না পেরুনো কিশোরীটি, বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল চাকরির খোঁজে। ট্রেনের জানলা দিয়ে যখন তার এতদিনের চিরচেনা ঠিকানা মিলিয়ে যাচ্ছিল হুশ করে, তখন মন তার যত‌ই কেঁদে উঠুক, মান্যা তাকে বাঁধল প্রতিজ্ঞার রশি দিয়ে কষে।

ওয়ার্শো থেকে দেড়শো কিমি উত্তরে একটা গ্রামে এক কৃষিবিদ মিস্টার জোরাওয়াস্কি একটা বিট-সুগারের কারখানা চালাতেন। তাঁর বিশাল পরিবারে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য গভর্নেসের চাকরি নিল মান্যা অর্থাৎ মারিয়া স্ক্লোদোস্কা। আসলে এখানে তাকে মান্যা বলে ডাকার কেউ নেই। ভালো নাম মারিয়া, এই নামেই বাইরে সবাই তাকে ডাকত। যাই হোক, এটা টুইশানির চাইতে মোটামুটি ভালো মাইনের চাকরি বলা চলে। কৃষিবিদের বড় মেয়েটির সাথে খুব ভাব হয়ে গেল মান্যার। এতটাই ভাব যে দুজনে মিলে লুকিয়ে চুরিয়ে কারখানার শ্রমিকদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের বিনা পয়সায় পড়াতে লাগলেন। ঘটনা হচ্ছে, মান্যার কিশোরী অন্তরে এই সময় প্রথম প্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হল। জোরাওয়াস্কি পরিবারের বড় ছেলে কাজমিয়ার্জের প্রেমে পড়ল সে। ছেলেটা কৃষি-প্রযুক্তিবিদ্যা নিয়ে ওয়ার্শোতে পড়ছে। ছুটিতে বাড়ি এসেছিল।‌ মারিয়া আর কাজমিয়ার্জ দুজনে মিলে ঠিক করল বিয়ে করে নেবে। কিন্তু জোরাওয়াস্কিদের খানদানি পরিবার একজন গভর্নেসকে বাড়ির বড় বৌ হিসেবে মেনে নেবে, এতটা উদার ছিল না। আর কাজমিয়ার্জের‌ও অতটা সাহস হয় নি বাড়ির অমতে বিয়ে করার। ফলে যা হবার তাই হল। কিশোরীর হৃদয় হল ভেঙে খান খান। কান্নায় ভেঙে পড়ে মারিয়া, 'ছেলেগুলো গরীব ঘরের মেয়েদের বিয়ে করতে না পারলে শয়তানের মুখে ঠেলে দিক, তা না করে আমাদের সরল নিষ্পাপ মনটাকে ভেঙে দেবে এ ভাবে!'

এসব সত্ত্বেও বৃথা আশা মরতে মরতেও মরে না বলে আরো কিছুকাল টিকে র‌ইল চোরাপ্রেম। অবশ্য জোরাওয়াস্কি পরিবার দয়া করে মারিয়াকে চাকরি থেকে ছাড়ায় নি। এক ছাদের তলায় থেকেও পরিবারের একজন হিসেবে স্বীকৃতি না পাবার কষ্ট, লাঞ্ছনা, ভালোবাসা ভেঙে যাবার সুতীব্র কষ্ট, সব, সবকিছু মারিয়া দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেল শুধু দিদিকে কথা দিয়েছিল প্যারির খরচা জোগাবে বলে, তাই। অবশ্য মাঝে মাঝে কি মনে হত না, প্যারি ফ্যারি গিয়ে আর পড়াশোনা করে কাজ নেই? মনে হয়, কিন্তু তারপর গরীব ঘরের মেয়ে হিসেবে অপমানিত হবার কথাটাও মনে পড়ত। আবার রোখ চেপে যেত। একা একা সময় যখন কাটত না, পড়ার ব‌ই তখন তার নীরব প্রেমিক হয়ে উঠত। যা পেত সামনে তাই পড়ত---সমাজবিদ্যা, সাহিত্য, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন। অঙ্কটা সে বাবার কাছে শিখতে শুরু করল নতুন করে, চিঠিচাপাটি মারফৎ। পদার্থবিদ্যাও আয়ত্ত করতে বেশি সময় লাগছিল না তার। এর পাশাপাশি কারখানার এক কেমিস্টের কাছে শিখতে শুরু করল রসায়ন। নতুন নতুন অধ্যায় শিখে তার আনন্দ আর ধরে না।

তিন বছর গভর্নেসের চাকরি করে ওয়ার্শো ফিরে এল মারিয়া। কাজিমিয়ার্জের সাথে সম্পর্কটা ছিঁড়ে এসেছে সে। ছেলেটা অঙ্কে ডক্টরেট করে পরে ক্রাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবে। এসব পরের কথা, যাক গে। ওয়ার্শোতে এসে মারিয়া আবার কয়েকজনকে পড়ানো শুরু করেছে। এখন বাবার আরেকটা নতুন চাকরি হয়েছে। তাতে তিনি যা টাকা পাচ্ছেন তাতে করে দুজনের তো ভালোভাবে চলে যাচ্ছেই, উপরন্তু ভ্লাদিস্লাভ ভাবছেন, উদ্বৃত্ত কিছু টাকা এখন থেকে প্যারিতে ব্রোন্যাকেও পাঠাবেন। এর মধ্যে মারিয়ার জীবনে হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখার একটা আশ্চর্য সুযোগ এল। মারিয়াদের এক তুতো ভাই, নাম, জোসেফ বোগুস্কি। ইনি আবার রাশিয়ার সেই বিখ্যাত পর্যায়সারণীখ্যাত রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভের প্রাক্তন ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট। ওয়ার্শোতে তিনি আছেন মিউজিয়াম অফ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড এগ্রিকালচার নামে একটা সংস্থায়। জার জানলে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দণ্ড দেবে, তাই বলা বারণ, এটা নামেই মিউজিয়াম, আসলে এটা পোলিশ ছেলেমেয়েদের পোলিশ ভাষায় বিজ্ঞান শেখার একটা গোপন ল্যাবরেটরি। সেইখানে রবিবার রবিবার রসায়ন পড়াতে আসেন বোগুস্কির এক সহকর্মী রসায়নবিদ। মারিয়া সেই ক্লাস করার সুযোগ তো ছাড়েই না, উল্টে ফাঁক পেলেই বার্নার টার্নার জ্বেলে ব‌ইয়ের পরীক্ষাগুলো নিজে হাতেকলমে করে দেখতে চায় ফলটা ব‌ইয়ের সাথে মিলছে কিনা। কোনো উপযুক্ত শিক্ষক নেই বলে বেশীরভাগ সময়ই ফল মেলে না। তবু এইখানে মারিয়ার হাতেখড়ি হল পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক জীবনে। বিজ্ঞানের পরীক্ষা আসলে ঠিক কিরকম জিনিস, ধীরে ধীরে এখন সেটা বুঝছে মারিয়া। যত মেলে না, তত‌ই রোখ চেপে যায় তার। একটা সময় সে বুঝতে পারে, প্যারি তাকে যেতেই হবে। সত্যিকারের পড়াশোনা আর পরীক্ষাগার, সেইসাথে চাই সত্যিকারের একজন গুরু, না হলে এইভাবে ওয়ার্শোয় এই ল্যাবে একলা বসে বিজ্ঞান শেখা যাবে না।

ওদিকে প্যারিতে মেডিক্যাল কলেজে পড়তে পড়তে ব্রোন্যা কি করছিল? আঠারোশ পঁচাশিতে সে এসে ভর্তি হয়েছিল সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এক পোলিশ ডাক্তারকে, নাম ক্যাশিমির দুয়োস্কি, তার ভালো লেগে যায়। দুয়োস্কি আবার পোল্যান্ড থেকে নির্বাসিত বিপ্লবী। পাঁচ বছর পরে গাইনোকলজিস্টের ডিগ্রি পেয়েই ব্রোন্যা বিয়ে করে ক্যাশিমিরকে আর সংসার পাতে সেখানে। তারপর থেকে সে চিঠি লিখে মারিয়াকে প্যারিতে আসতে জোরাজুরি শুরু করে। এখন সে আর তার স্বামী দুজনে একসাথে বোনটার থাকা খাওয়া আর পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে পারবে, অসুবিধা হবে না।

মারিয়া মনটা আবার বাঁধল। আঠারোশ একানব্বই সালের নভেম্বরের একটা দিনে চব্বিশ বছরের পোলিশ মারিয়া প্যারিতে পাড়ি জমাল।

প্যারির সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান আর অঙ্কের পাঠ্যক্রমে ভর্তি হবার সময় মারিয়া নিজের নামটাকেও পাল্টে ফরাসী উচ্চারণ অনুযায়ী 'মেরি' করে ফেলল। মেরির কাছে যতটুকু টাকা ছিল সেটা দিয়ে পড়ার খরচ চালানো ছাড়া অতি নিম্নমানের বাসা ভাড়া আর খাবার জোটানোর সামর্থ্য ছিল। দিদির বাসায় থাকতে চাইলেও উপায় নেই। সবসময় বিপ্লবের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এত হ‌ইচ‌ই লেগে থাকে ঘরে যে দুদণ্ড নিশ্চিন্তে বসে পড়াশোনা করার উপায় ছিল না মেরির। অগত‌্যা নিজেই নিজের ব্যবস্থা দেখে নিয়েছে মেরি, আধপেটা খেয়ে আর শহর থেকে অনেক দূরে অস্বাস্থ্যকর বাসায় ভাড়া নিয়ে থাকছিল সে।‌ মাসের সম্বল চল্লিশ রুবলের মত। খিদেয় কোনো কোনোদিন অজ্ঞান হয়ে যাওয়া লড়াকু মেয়েটা তবু ১৮৯৩ সালে যখন পদার্থবিদ্যার ডিগ্রিটা পেল, তখন দেখা গেল সে যে শুধু ক্লাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি নাম্বার পেয়ে প্রথম হয়েছে তাই নয়, এমনকি শ্রেষ্ঠ পোলিশ ছাত্রছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ আলেক্সান্দ্রোভিচ স্কলারশিপ পর্যন্ত পেয়েছে। এটা পেয়ে টাকার অভাবে পড়া শেষ করে মেরির পোল্যান্ড ফিরে যাবার সম্ভাবনা বাতিল হল। শুরু হল 'দ্য সোসাইটি ফর দ্য এনকারেজমেন্ট অফ ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি'-এর সহায়তায় বিভিন্ন রকম রাসায়নিক সংযুক্তির স্টিলের চৌম্বক ধর্ম নিয়ে গবেষণা।

১৮৯৪ সালের প্রথমভাগে মেরি অঙ্কের ডিগ্রিটাও অর্জন করল। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি যে গবেষণার কাজটা সে চালাচ্ছে, তার জন্য দরকার একটা বড়সড় গবেষণাগার। মেরির থিসিস সুপারভাইজার অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিপম্যান। তাঁর ল্যাবে মেরির জন্য যে জায়গা বরাদ্দ, তা অপ্রতুল। এমনসময় এক বন্ধুস্থানীয় অধ্যাপক খবর নিয়ে এলেন যে প্যারিতে পদার্থবিজ্ঞানী পিয়ের কুরির ল্যাবে মেরি গবেষণা চালানোর উপযুক্ত জায়গা পেতে পারে। কথামত মেরি পিয়েরের ল্যাবরেটরিতে হাজির হয়ে দেখল, পিয়েরের ল্যাবরেটরি ছোটো, কিন্তু তার হৃদয়ের আকাশটা অনেক বড়। তখন পিয়েরের পঁয়ত্রিশ বছর বয়স, আর মেরি সপ্তবিংশতি ছোঁয়ায়। মেরিকে না ভালো লেগে উপায় ছিল না পিয়েরের। গবেষণা থেকে ভালোবাসা আর ভালোবাসা থেকে গবেষণা। একদিকে পিয়ের মেরিকে বলছে, তুমি পিএইচডি করতে নাম লেখাও এখানে। অন্যদিকে মেরি পিয়েরকে বলছে, তুমি এত মূল্যবান গবেষণা করছ, অথচ পিএইচডি ডিগ্রির জন্য থিসিস লিখছ না কেন! যেন দুজনে দুজনের পরিপূরক। একটা অনাড়ম্বর, ধর্মবিহীন বিয়ের মাধ্যমে ভালোবাসা সংসারের রূপ পেল। কনের পোষাক ল্যাবের গাঢ় নীল রঙের গাউন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে উপহার ছিল মধুচন্দ্রিমায় বিশ্বভ্রমণের জন্য দুটো বাইসাইকেল। ১৮৯৫ সালের ২৬শে জুলাই। সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী মেরি স্ক্লোদোস্কা এখন পদার্থবিজ্ঞানী পিয়ের কুরির স্ত্রী, মেরি স্ক্লোদোস্কা কুরি, অর্থাৎ আমাদের চেনা সেই নাম, মাদাম কুরি---পিয়েরের সবচাইতে মূল্যবান আবিষ্কার! ঠিক এইখান থেকেই মাদাম কুরির জীবন তো বটেই, মানুষের সভ্যতার‌ও মোড় ঘুরে যাবার শুরু।

এই বিয়ের বছর আর তার পরের বছরটায় আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়েছিল মানুষের সভ্যতায়। সেটা হচ্ছে অঁরি বেকেরেলের ল্যাবের ড্রয়ারে ইউরেনিয়াম নামে একটা মৌলের লবণের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার। এতদিন দৃশ্যমান আলোর যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল ফটোগ্রাফিক ফিল্মে দাগ ফেলার কাজে, তাতে ভাগ বসিয়েছিল উইলিয়াম রন্টজেনের এক্স রশ্মি আর বেকেরেলের তেজস্ক্রিয় রশ্মি। কুরি দম্পতি গবেষণা শুরু করলেন ইউরেনিয়াম লবণগুলোর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে। এর আগে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন তেজস্ক্রিয়তার কারণ হয়ত অদৃশ্য পরমাণুদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ। বিজ্ঞানী মেরি কুরি ধারণা করলেন তেজস্ক্রিয়তার উৎস হচ্ছে ইউরেনিয়াম পরমাণু নিজেই। ইউরেনিয়ামের পরিমাণ যত বেশি, তেজস্ক্রিয়তাও তত বেশি। পিয়ের কুরি আর তাঁর এক ভাই, তিনিও বড় বিজ্ঞানী, আগেই বানিয়েছিলেন ইলেকট্রোমিটার নামে একরকম যন্ত্র। এটা দিয়ে বাতাসে আধানের পরিমাণ মাপা যেত। তেজস্ক্রিয় রশ্মি যেহেতু আশেপাশের বাতাসে বৈদ্যুতিক আধান তৈরি করে, তাই সে রশ্মির পরিমাণ মাপতে মেরিকে ঐ যন্ত্রটা ব্যবহার করতে দিলেন পিয়ের। মেডিকেল কলেজের একটা পোড়ো ব্যবচ্ছেদ-ঘরে আলো বাতাসের চলাচল একেবারে নেই। এটাই কুরি দম্পতির ল্যাবরেটরি। পিয়েরের মূল কাজ কেলাসের পিজোইলেকট্রিক ধর্ম নিয়ে। কিন্তু মেরির এই অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির কাজ যেন তাঁর‌ও নেশা হয়ে উঠল। এর‌ই মাঝে তাঁদের কোল আলো করে জন্মাল প্রথম কন্যাসন্তান। নাম রাখা হল আইরিন। সংসারের আয় বাড়াতে গবেষণার পাশাপাশি মেরি শিক্ষকতার পেশায় এলেন।

জার্মানির রূপোর খনিতে খোঁড়াখুঁড়ি করতে করতে গাঁইতি যেই একরকম কালো পাথরে ঠং করে আওয়াজ করে ধাক্কা খেত, শ্রমিকরা বুঝে যেত আর রূপোটুপো পাবার সম্ভাবনা নেই। ব্লেন্ড মানে কিনা অশুদ্ধ, তাই পিচের মত কালো রঙের ঐ অশুদ্ধ পাথরগুলোর নাম পিচব্লেন্ড। এই পিচব্লেন্ড‌ই হয়ে উঠল কুরিদের জন্য তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের মূল উৎস। কিন্তু কুরির সময়ে ফ্রান্সে এর দাম তাঁদের সাধ্যের বাইরে। শেষমেশ ভিয়েনার বিজ্ঞান পরিষদের দাক্ষিণ্যে কয়েক টন পিচব্লেন্ড পাওয়া গেল। পিচব্লেন্ডে শুধু ইউরেনিয়াম নয়, আছে আরেকটা তেজস্ক্রিয় মৌল থোরিয়াম। ১৮৯৮ সালের ১২ই এপ্রিল কুরিরা তাঁদের এই আবিষ্কারের কথা অধ্যাপক লিপম্যানের সাহায্যে প্রকাশ করলেন অ্যাকাডেমির গবেষণাপত্রে। পিচব্লেন্ড নিয়ে কাজ করতে করতে মেরি বুঝতে পারছিলেন, এর মধ্যে ইউরেনিয়াম বা থোরিয়ামের চাইতেও তেজস্ক্রিয় অন্য কিছু মৌল রয়েছে, যার আবিষ্কার এখনো পর্যন্ত কোনো মানুষ করে উঠতে পারে নি। এই প্রকল্প ঠিক কিনা তা যাচাই করতে তাঁরা টনের পর টন পিচব্লেন্ডের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন। প্রকাণ্ড সব কড়াই। তাতে তেজস্ক্রিয় আকরিক পিচব্লেন্ডের সাথে গ্যালন গ্যালন অ্যাসিড, ক্ষার। ছোটো বদ্ধ ঘরে। সে এক অবর্ণনীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তবু রোখ চেপে গেলে বিজ্ঞানী আর কবে নিজের শরীরের পরোয়া করেছেন! হায়! তখন যদি তাঁরা মানুষের শরীরে এই রশ্মিগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানতেন, তাহলে হয়ত একটু হলেও সতর্ক থাকতে পারতেন। যাই হোক, অবশেষে ১৮৯৮ সালের‌ই জুলাই মাসে একটা নতুন তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কার করে ফেললেন তাঁরা। প্রবল স্বদেশপ্রেম মাদাম কুরির তাঁর জন্মভূমি, পরাধীন পোল্যান্ডের প্রতি। তাই এর নাম দিলেন, পোলোনিয়াম। কাজ এখানেই থামে নি। ডিসেম্বর নাগাদ পাওয়া গেল আরেকটা তেজস্ক্রিয় মৌল, যার তেজ ইউরেনিয়ামের থেকেও লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি। রশ্মির ল্যাটিন প্রতিশব্দ 'রে' থেকে এই মৌলের নাম রাখা হল রেডিয়াম। আজ আমরা 'তেজস্ক্রিয়তা' অর্থাৎ 'রেডিওঅ্যাক্টিভিটি' নামে যে শব্দটিকে জানি, সেই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মাদাম কুরিই। তাঁদের সম্মান জানিয়ে পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয়তার একটা এককের নাম রাখা হয়েছিল 'কুরি'।

একজন নারী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থার সভাগৃহে অগণিত লোকের সামনে তাঁর‌ই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিচ্ছেন, এটা তখনকার দিনে পুরুষ-অধ্যুষিত দুনিয়ায় যেমন বিস্ময়কর ছিল, তেমনি আবিষ্কারগুলো সত্যিই খাঁটি কিনা তাই নিয়ে বাকি বিজ্ঞানীদের মধ্যে সন্দেহ‌ও কম ছিল না। অত‌এব, এরপরে পোলোনিয়াম আর রেডিয়ামকে বিশুদ্ধ করার কাজে ব্যাপৃত হলেন কুরি-দম্পতি। এক টন পিচব্লেন্ড থেকে মাত্র ০.১ গ্রাম রেডিয়ামের লবণ মেলে। এর থেকে সহজেই অনুমেয় যে বিশুদ্ধিকরণের কাজটা কতটা দুঃসাধ্য ছিল টেকনোলজি-বিহীন সেই আদ্যিকালের ল্যাবরেটরিতে। ১৮৯৮ থেকে ১৯০২ পর্যন্ত এই কাজ চলাকালীন‌ই তাঁরা বুঝতে পারেন যে রেডিয়াম মৌলটা সুস্থ জীবকোষের চাইতে ক্যান্সার-আক্রান্ত জীবকোষ তাড়াতাড়ি ধ্বংস করতে পারে। লাগাতার তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে তাঁদের হাতের আঙুলগুলো হয়ে গেছিল ক্ষতবিক্ষত। সিনেমায় যেমন তেজস্ক্রিয় আলোর রঙ সবুজ দেখায়, বাস্তবে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের তেমন কোনো রঙ‌ই হয় না। আর তাই খালি চোখে দেখে বোঝাও সম্ভব ছিল না যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বিকিরণ বেরিয়ে আসছে! এমনি করে পিয়েরের ফুসফুসে হয়ত ক্যান্সার‌ই হয়ে গেছিল। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে নিজের আবিষ্কার, বিশুদ্ধ রেডিয়ামের মোহে পড়ে গেছিলেন মেরি নিজেই। ল্যাবরেটরির অ্যাপ্রনের পকেটে তো বটেই, এমনকি রাতে শোবার সময় পর্যন্ত বিছানার পাশে নিয়ে শুতেন রেডিয়ামের নমুনাভরা একটা টেস্টটিউব। এ যে তাঁর সারাজীবনের সেরা আবিষ্কার---গর্ব করার মত কথা তো বটেই। আর মানুষের উপকারে আসবে বলে এমন একটা জিনিসের কোনো পেটেন্ট নেন নি কুরি-দম্পতি।

কিন্তু আমাদের মানুষের সভ্যতা মাদাম কুরির উপকারে আসবে বলে তৈরি হয় নি। ১৯০০ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেয়া শুরু হল। পিয়ের কুরি প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলেন। ১৯০৩ সালে মেরিও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিপম্যানের তত্ত্বাবধানে। এমন সময় লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট পিয়ের কুরিকে আমন্ত্রণ জানালেন তেজস্ক্রিয়তার উপর ভাষণ দিতে। রেডিয়াম নিয়ে তখন পাশ্চাত্যে চলছে তুমুল ব্যবসা। যে কোনো বৈজ্ঞানিক সভায় তেজস্ক্রিয়তা তখন একটা গরমাগরম বিষয়, যাকে বলে হট টপিক! অথচ বিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক-প্রসূত চিন্তাধারায় স্নাত হয়ে জন্ম হল রেডিয়ামের, শুধু নারী বলে সেই বিজ্ঞানীকে বক্তৃতাসভা থেকে ব্রাত্য করে রাখল পাশ্চাত্যের নারীমুক্তির ধ্বজাধারী সভ্যসমাজ। সেই বছর‌ই ডিসেম্বরে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের স্বীকৃতি-স্বরূপ পদার্থবিদ্যায় সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের তালিকায় নাম উঠল অঁরি বেকেরেল আর পিয়ের কুরির। শুভানুধ্যায়ী এক বিজ্ঞানীর কাছে একথা জেনে প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন পিয়ের নিজে---মেরি আমার সহধর্মিণী হতে পারে, কিন্তু আমার ল্যাব-অ্যাসিস্টেন্ট নয়। তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কারে মেরির‌ই বরং অবদান বেশি। আরো অনেক মানুষের মত মানুষ বিজ্ঞানীদের সমর্থনে অবশেষে বেকেরেল আর পিয়েরের নামের সাথে জুড়ল মেরির নামটাও---প্রথম মহিলা নোবেলজয়ী হলেন মাদাম কুরি।

১৯০৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান ইভের জন্ম দিলেন মেরি। দুর্ভাগ্য এমন‌ই যে এর পর দুই বছর যেতে না যেতে রাস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে মাথা ফেটে মারা গেলেন অন্যমনস্কভাবে বৃষ্টিভেজা রাস্তা পেরোতে যাওয়া পিয়ের। ১৯০৬ সালের ১৯শে এপ্রিল। মেরির গোটা জগৎ যেন অন্ধকার হয়ে গেল। সবে এর বছর চারেক আগে বাবাকে হারিয়েছেন, আজ স্বামীকে। কিন্তু বিপদ আর বিষাদের এই চরম সীমায় পৌঁছেও রেডিয়ামের আলোর মত জ্বলে র‌ইল মেরির অক্লান্ত অধ্যবসায় তথা গবেষণা আর পিয়েরের বৃদ্ধ বাবার সাথে সাথে নিজের মেয়েদের দেখভাল করা। কৃপা করে প্যারি বিশ্ববিদ্যালয় মেরিকে পিয়েরের ছেড়ে যাওয়া অধ‌্যাপক পদটাতে নিয়োগ করল বটে, তবে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর উপযুক্ত গবেষণাগার কিংবা টাকা, কোনোটাই দিল না প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হ‌ওয়া সত্ত্বেও। পাস্তুর ইন্সটিটিউটের এক বিজ্ঞানীর সাহায্যে আলাদা করে মেরি বানালেন রেডিয়াম ইনস্টিটিউট।

১৯১০ সালে আশার আলো দেখা দিল। রেডিয়াম মৌলের বিশুদ্ধ কেলাস পৃথক করতে সফল হলেন মেরি। দেশে-বিদেশে মাদাম কুরির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিল দ্রুত। যশের সমানুপাতে অর্থ জোটেনি মেরির, তবে পিছনে লাগল পাপারাজ্জি, খবরের কাগজে মুচমুচে খবর পরিবেশনের তাগিদে। পদার্থবিদ পল ল্যাঙ্গেভিন, যিনি ছিলেন পিয়েরের অন্যতম সেরা ছাত্র, তাঁর সাথে বিধবা মেরির পরকীয়া চলছে---এমনসব আদিরসাত্মক খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মত। নারী বিজ্ঞানের গবেষণায় সর্বোচ্চস্তরে পৌঁছেছে, অধ্যাপনা করছে, নোবেলজয়ী হয়েছে, এসব কিছু ধুলোয় না মেশাতে পারলে এক শ্রেণীর পরশ্রীকাতর মানুষের শান্তি হচ্ছিল না। তার উপর জাতে পোলিশ, থাকে ফ্রান্সে। তবু সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৯১১ সালে রেডিয়াম আর পোলোনিয়াম আবিষ্কার, রেডিয়ামের একক কেলাস তৈরি আর সর্বোপরি, তেজস্ক্রিয় মৌলগুলোর রসায়ন-দুনিয়ার সিংহদরজা খুলে দেবার জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেলেন মেরি। দুই বিজ্ঞানে একটা করে নোবেল পুরস্কার জিতে ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন মাদাম কুরি।

মেরি স্ক্লোদোস্কা কুরি কখনো স্ক্লোদোস্কা পদবী ত্যাগ করেন নি। তাঁর গোটা জীবনটাই উৎসর্গীকৃত মানুষের জন্য। নাহলে এমন অম্লানবদনে কেউ বলতে পারেন, ব্যক্তির চাইতে আইডিয়া বেশি জরুরি, আইডিয়ার দিকে নজর দাও। এমন অনাড়ম্বর জীবন কোনো নোবেলজয়ীর পক্ষে যাপন করা সম্ভব? উপহার পাওয়া একগ্রাম দুর্মূল্য রেডিয়াম কেউ আপামর মানুষের ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিলিয়ে দেয়? নোবেল পুরস্কারের গোটা অর্থটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ফ্রান্সের জন্য ব্যাঙ্কে জমা রাখতে যায়? সাধে কি আর বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন বলে গেছেন, 'মাদাম কুরি হচ্ছেন সেইসমস্ত বিরল সেলেব্রিটিদের একজন, খ্যাতি যাঁকে কখনো দুর্নীতিপরায়ণ করে তুলতে পারে নি!' নাহলে হাজার বিপদ হতে পারে জেনেও কে আর পাগলের মত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঠে নিজের সতের বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে নেমে পড়ে ভারী এক্স-রে মেশিন-ওয়ালা গাড়ি চালাতে? অন্ততঃ দশ লক্ষ আহত সৈন্যের আঘাতপ্রাপ্ত স্থান এক্স-রশ্মির মাধ্যমে স্ক্যান করিয়ে তাদের হাত-পা কেটে বাদ যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন মাদাম কুরি। হ্যাঁ, মেয়ের মত দুটো মেয়ে পেয়েছিলেন বটে কুরি-দম্পতি। আইরিন ছিল মেরির বন্ধুর মত। পরে আইরিন কুরি আর তাঁর স্বামী ফ্রেডরিখ‌ও কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারটা আবিষ্কার করে নোবেলজয়ী হয়েছিলেন।

ভগ্নস্বাস্থ্যের মেরি ১৯৩৪ সালে শেষবারের মত মাতৃভূমি পোল্যান্ড যান। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে ফ্রান্সের একটা সানাটোরিয়ামে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ঐ বছর‌ই ৪ঠা জুলাই অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় প্রয়াত হন মেরি। অবশ্য অ্যানিমিয়ায় মারা না গেলেও ক্যান্সার-জাতীয় রোগে ভুগে মরতেই হত মেরি কুরিকে। গ্রীক দেবতা প্রমিথিউস নিজের জীবন বিপন্ন করে আগুন এনেছিলেন পৃথিবীতে। বাকি দেবতারা একথা জানতে পারলে জ্যান্ত অবস্থায় শিকল-বাঁধা প্রমিথিউসের বৃক্ক খেতে নির্দেশ দেন একটা বুভুক্ষু ঈগল পাখিকে। প্রমিথিউসের জায়গায় মাদাম কুরি আর ঈগলের জায়গায় তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণকে বসালে, এও যেন সেইরকমই একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৩৫ সালে ফ্রান্সের সেই রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের সামনে সদ্যপ্রয়াত মাদাম কুরির একটা মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। ঘটনা হচ্ছে, এক বৃদ্ধকে সেই মূর্তির বেদীর সামনে বসে ধ্যানমগ্ন থাকতে দেখা যেত, প্রায়‌ই। সবাই খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, ভদ্রলোক পোল্যান্ডের ক্রাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। নাম ড. কাজমিয়ার্জ জোরাওয়াস্কি। উপরের মর্মর মূর্তিটি তাঁর কৈশোরের প্রেমিকা মান্যার, এমনটাই দাবী বৃদ্ধের। আসলে মান্যা হচ্ছেন রেডিয়ামের বিকিরণের মত, তাঁকে ভুলতে পারেন না কেউ। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের এখনকার নাম কুরি ইনস্টিটিউট। বৃদ্ধ জোরাওয়াস্কি জানলে আশ্চর্য হতেন, তিনি যেখানে বসে আছেন, সেখান থেকে চার পাঁচ কিলোমিটার দূরে ফ্রান্সের জাতীয় লাইব্রেরির একটা ঘরে একটা সীসের বাক্সের মধ্যে মান্যার রান্নাঘর আর গবেষণাগারে ব্যবহৃত খাতাগুলো রয়েছে, যেগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে গেলে বিকিরণরোধী বিশেষ পোশাক পরে আর ইনশিয়োরেন্সে স‌ইসাবুদ করে ঢুকতে হয়, কারণ সেগুলো রীতিমতো তেজস্ক্রিয় এবং আজ থেকে দেড় হাজার বছরের‌ও অনেক পরে পর্যন্ত খাতাগুলো রেডিয়ামের ছোঁয়ার দরুণ ভয়ানক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ করে চলবে। মান্যা, সেই যে ছোট্ট কিশোরীটি, এতটা তেজের অধিকারিণী কবে থেকে হয়ে গেলেন, ভেবে জোরাওয়াস্কি নিশ্চিত অবাক না হয়ে পারতেন না।

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb