ভারতে মৎস্য বিজ্ঞানের পথিকৃৎ ডা. ফ্রান্সিস ডে

লেখক - ডঃ শতাব্দী দাশ

 

ফ্রান্সিস ডে (Francis Day) ছিলেন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে সেনাবাহিনীর একজন ডাক্তার। তবে, সেই পরিচয়টি ছাপিয়ে যে পরিচয় তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে, তা হল , একজন প্রকৃতিবিদ এবং মৎস্য বিজ্ঞানী। তিনি মাদ্রাজ প্রভিন্সে কাজ করতেন এবং ভারত ও বর্মায় মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল হন।
এদেশে মৎস্য বিজ্ঞানের তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি "The Fishes of India " বইতে ভারতে পাওয়া যায় এমন 300 র বেশি মাছের বর্ণনা দিয়েছেন, যা ধরা আছে ওই বইয়ের দুটি খন্ডের পাতায় পাতায়। এছাড়া, বিখ্যাত বই "Fauna of British India" র মৎস্য বিষয়ক খন্ডগুলি ও তাঁরই লেখা। তিনি দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি পর্বতে ট্রাউট (Trout) মাছ এনে ছেড়েছিলেন, যেটি ঠান্ডা আবহাওয়ার মাছ এবং বর্তমানে ভারতের অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলেও পাওয়া যায়। তাঁর সংগ্রহের বিভিন্ন মাছের নমুনা তিনি বিভিন্ন সংগ্রহশালায় দান করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে লন্ডনের ব্রিটিশ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে।
ফ্রান্সিস ডে র জন্ম 1829 সালের 2 মার্চ ব্রিটেনের পূর্ব সাসেক্সের মেয়ার্সফিল্ড নামক স্থানে একটি অবস্থাপন্ন পরিবারে। তিনি 1849 সালে সেন্ট জর্জ হসপিটালে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন। 1851 সালে তিনি MRCS ডিগ্রি লাভ করেন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাজ বিভাগের সেনাবাহিনীতে সহকারী সার্জেন হিসেবে যোগ দেন। কাজের সূত্রে তাঁকে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থান, যেমন ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, মারকারা প্রভৃতি জায়গায় যেতে হত। এই সময় তিনি এইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
1857 সালে ফ্রান্সিস ডে অসুস্থতার কারণে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যান। এই সময় তিনি লিনিয়ান সোসাইটির সদস্য হন। এই বছর নভেম্বর মাসে তিনি এমা কোভেকে বিবাহ করেন। 1858 সালে তিনি আবার ভারতের হায়দ্রাবাদে ফিরে আসেন, পরে কোচিনে যান। এই সময় তিনি ভারতবর্ষের মৎস্য সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। 1859 থেকে 1864 সাল পর্যন্ত তিনি কোচিনে ছিলেন। 1864 সালে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে ইংল্যান্ডে যান এক বছরের জন্য। এই অবসরে তিনি জ্যুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনে কোচিনের মাছের ওপরে একটি গবেষণাপত্র জমা দেন। 1865 সালে তাঁর গবেষণাপত্র "The Fishes of Malabar " প্রকাশিত হয়। 1866 তে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং তামিলনাড়ুর উটিতে ট্রাউট মাছ এনে ছাড়েন। তাঁর এই প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এরপর কার্যসূত্রে তিনি কুর্নুলে যান এবং 1867 তে মেটেরিয়া মেডিকার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই সময় ছুটি নিয়ে তিনি উটকামন্ড বা উটিতে ফিরে যান এবং ট্রাউট মাছ এদেশের জলে ছাড়ার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকেন। কুর্নুলে একই সময়ে কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় তিনি সে ব্যাপারেও কাজ করেন । 1868 সালে তিনি মাদ্রাজ ও ওড়িশা অঞ্চলে মাছের বিষয়ে সার্ভের কাজে প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময় তিনি ভারতের মিষ্টি বা স্বাদু জলের মাছের পঞ্জীকরণ (Catalogue) করার কাজ শুরু করেন। 1869 সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হলে 1870 এ তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ঐ বছরই তিনি সারা ভারত ও বর্মার ফিশারিজ বিষয়ে পরিদর্শক নিযুক্ত হন। সেই উপলক্ষে তাঁকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও সার্ভের কাজ করতে হয়। তবে একটি দুর্ঘটনার কারণে তিনি আবার ফিরে যেতে বাধ্য হন। সেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার পর তিনি 1871সালে "ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ ফিশারিজ" নিযুক্ত হন এবং গঙ্গা, যমুনা, সিন্ধু বিধৌত অঞ্চলে সার্ভের কাজ করেন । এই কাজ করার সময় তিনি বিভিন্ন স্থান সহ কলকাতা ও সিমলাতেও কাটিয়েছেন। পক্ষীতত্ত্ববিদ অ্যালান অক্টেভিয়ান হিউম যখন সিন্ধু প্রদেশে পাখি সংগ্রহে ব্যাপৃত ছিলেন তখন ফ্রান্সিস ডে ঐ অভিযানে তাঁর সহযাত্রী হন এবং হিউমের সংগৃহীত প্রচুর মাছের নমুনা তাঁর সংগ্রহে আসে (1871)। পরে তিনি দুবছর ছুটি নিয়ে আবার স্বদেশে ফেরেন এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য বই "Fishes of India " রচনা করেন। এই কাজের জন্য তাঁকে ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে হয়েছিল।
"The Fauna of British India, including Ceylon and Burma" বইতে ফ্রান্সিস ডে মাছের ওপর দুটি খন্ড লিখেছেন, যাতে তিনি 1400 প্রজাতির মাছের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের লিনিয়ান সোসাইটি এবং জ্যুলজিক্যাল সোসাইটির ফেলো ছিলেন। তিনি "Order of the Crown of Italy " সম্মানে ভূষিত হন এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া পেয়েছিলেন "Companion Of The Order of The Indian Empire (CIE) " উপাধি।
যদিও ফ্রান্সিস ডে একজন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাণিবিদ্যার কিউরেটর অ্যালবার্ট গুন্থার ডে'র কাজ সম্পর্কে অনেক সময় সংশয় প্রকাশ করেছেন। ফলে ডে তাঁর সংগ্রহের বেশির ভাগটাই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দিতে না পেরে অস্ট্রেলিয়ার মিউজিয়ামে বিক্রি করে দেন (1883)। 1888 সালে তাঁর সংগৃহীত অল্প কিছু মাছের নমুনা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হয়। 1889 সালে তিনি নিজের আঁকা মাছের ছবিগুলি জ্যুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনে দিয়ে দেন।
ইতিমধ্যে 1877 সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। এরপরেও তিনি ব্রিটেনের চেলটেনহাম ন্যাচারাল সায়েন্স সোসাইটির সভাপতি ছিলেন এবং সেখানে গবেষণাপত্র জমা দিতেন। এই চেলটেনহামেই অবসর গ্রহণের পর তিনি বাস করতেন এবং এখানেই 1889 সালের 10 জুলাই ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের সব বই চেলটেনহাম পাবলিক লাইব্রেরি তে দান করা হয়।
ফ্রান্সিস ডে কে সম্মান জানানোর জন্য একটি ভারতের সরীসৃপের নামকরণ করা হয়েছে Laudakia dayana,যেটি ভারতের হরিদ্বার অঞ্চলে পাওয়া যায়।

ফ্রান্সিস ডে র লেখা বই এর তালিকা-
Day, Francis (1863). The Land of the Permauls, Or, Cochin, Its past and its present.

Day, Francis (1865). The Fishes of Malabar. Bernard Quaritch, London.

Day, Francis (1878). The Fishes of India; being a natural history of the fishes known to inhabit the seas and fresh waters of India, Burma, and Ceylon. Volume 1

Day, Francis (1878). The Fishes of India; being a natural history of the fishes known to inhabit the seas and fresh waters of India, Burma, and Ceylon. Volume 2

Day, Francis (1888). The Fishes of India; being a natural history of the fishes known to inhabit the seas and fresh waters of India, Burma, and Ceylon. Supplement

Day, Francis (1889). The Fauna of British India, Including Ceylon and Burma. Fishes. Volume 1. Online

Day, Francis (1889). The Fauna of British India, Including Ceylon and Burma. Fishes. Volume 2. Online

 

 

 

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb