ডেঙ্গু মারার অস্ত্র

লেখক - সুপ্রিয় লাহিড়ি

 

এই লেখাটার উদ্দেশ্য ডেঙ্গু রোগের সম্বন্ধে একটা সুখবর দেওয়া। তার আগে একটু ভূমিকা করে নিই?

আমাদের প্রাইমারি স্কুলটা ছিল ছোট্ট, কিন্তু খুব সুন্দর আর ভালো। মনে আছে সেই স্কুলে, ক্লাস থ্রি কি ফোরের বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম ম্যালেরিয়া আর ডেঙ্গু বলে দুটো রোগের কথা।

এখন বললে অবিশ্বাস্য শোনাবে যে 1960এর দশকে, ম্যালেরিয়া আর ডেঙ্গুর কথা আমরা শুধু পাঠ্যবইতেই পড়েছিলাম। রোগ বা কোন রোগী দেখিনি। স্কুলবোর্ডের পাঠ্যবইতে ম্যালেরিয়ার সম্বন্ধে অনুচ্ছেদের পাশে বিশ্রী একটা সাদাকালো ছবি থাকতো। এক ধ্যাবড়া কালির ছাপের মত ছবিটায় ভালো করে দেখলে বোঝা যেত যে হাড় জিরজিরে একটা বাচ্চার ছবি, তার পেটটা ঢাকের মত ফোলা। এও লেখা ছিল যে ম্যালেরিয়াতে ভুগতে থাকলে প্লীহা বা পিলে বড় হয়ে গিয়ে ঐরকম হয়ে যায়। বাবা মাদের কাছে শুনতাম, যে ম্যালেরিয়াতে ভীষণ শীত করে জ্বর আসে। এটা শুনে আমার আবার বেশ মজা লাগতো, কটকটে গরমের মধ্যে লেপ মুড়ি দিয়ে শুতে পারলে মন্দ হয়না।

আর ডেঙ্গুর পাশে কোন ছবি ছিলনা, শুধু রোগের একটু বর্ণনা আর দুটো রোগই যে মশা থেকে হয়, এই কথা।

এর পরের কয়েক দশকে জনস্বাস্থ্যে আমরা এমনই উন্নতি করলাম যে আর বছর পনের কুড়ির মধ্যে দেশের সব শহরে ও গ্রামে ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গু দুইই সবিক্রমে ফিরে এলো। এখন তো প্রতি বছরই, বর্ষাকালে ম্যালেরিয়া আর ডেঙ্গু আমাদের সাথী হয়ে গেছে।

ম্যালেরিয়ার কথা অনেকেরই ভালো রকম জানা আছে। একটু ডেঙ্গুর কথা বলি। অন্যান্য আরো বহু সংক্রামক রোগের মত, ডেঙ্গুর প্রকোপ ও এশিয়া ও আফ্রিকার ট্রপিক্যাল অঞ্চলগুলোতেই বেশি। Aedes aegypti আর Aedes albopictus প্রধানত এই দুরকম মশার কামড় থেকে এই ভাইরাস আমাদের শরীরে ঢোকে। ডেঙ্গু ভাইরাস RNA ভাইরাসের গোত্রভুক্ত। ইয়েলো ফিভার, জিকা, জাপানিজ এননসেফালাইটিস ইত্যাদি আরো কিছু ভাইরাসের মত, এটাও Arbrovirus বা arthropod borne virus। তার মানে এদের বহন করে arthropod গোষ্ঠীর কোন পতঙ্গ, এ ক্ষেত্রে মশা।

 রোগের বিস্তারিত বর্ণনায় যাবনা। সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় 40 কোটি মানুষ ডেঙ্গুর কবলে পড়েন ও প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি প্রাণহানির কারণ হয় ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু সম্পর্কিত জটিলতা, যেমন ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। প্রতি বছর শুধু ভারতেই ডেঙ্গুর কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, আনুমানিক এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার।

এহেন অসুখের ভ্যাক্সিন তৈরি হবার খবর নিঃসন্দেহে সুখবর। বিশেষত ম্যালেরিয়া আর ডেঙ্গু এই দুই রোগের ভ্যাক্সিন বহুদিন ধরে পৃথিবীব্যাপী গবেষণার পরেও এতদিন আমাদের হাতের নাগালের বাইরেই ছিল। ম্যালেরিয়ার ভ্যাক্সিনের ওপর কাজ শুরু হয়, সেই 1960 এর দশকে আর সবে এই 2021 সালে ম্যালেরিয়ার প্রথম ভ্যাক্সিন Glaxo Smith Kline বা সংক্ষেপে GSKর Mosquirix, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছাড়পত্র পেলো। তাও ভ্যাক্সিনের মান অনুযায়ী এই Mosquirix যে একদম উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করার মত কিছু, তা কিন্তু নয়। এই ভ্যাক্সিন মাত্র 30% ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হয়। দেওয়ার পদ্ধতিও বেশ জটিল কারণ পরপর চার সপ্তাহে চারটি ইনজেক্সন নিলে তবেই একটা কোর্স সম্পূর্ণ হয়। তা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা খুশী এবং তাঁরা আশা করছেন যে এর সাহায্যে বিশ্বের যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া এনডেমিক, সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।

2018 সালে Dengvaxia নামে ডেঙ্গুর প্রথম ভ্যাক্সিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পরে অন্যান্য দেশে অনুমোদিত হয়। ভারতে Dengvaxia এখনো এপ্রুভড নয়।

এখানে বলে নেওয়া ভালো যে ডেঙ্গুর চার রকমের সেরোটাইপ হয়। এই Dengvaxia তার মধ্যে শুধু একটাকেই প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু এই ভ্যাক্সিন নেবার পরে সেই মানুষের যদি অন্য তিনটে সেরোটাইপের মধ্যে কোন একটার সংক্রমণ হয়, সে আক্রমণ অত্যন্ত গুরুতর হবে।

এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জীবনসংশয় ও হতে পারে। ডাক্তারী পরিভাষায় একে ADE, এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট বলা হয়। সেই জন্য Dengvaxia ভ্যাক্সিন যাদের আগে ডেঙ্গু একবার হয়ে গেছে, একমাত্র তাদের ওপরেই  প্রয়োগ করা যায়। এ কারণেই অনেক দেশ, যার মধ্যে ভারতও আছে, এই ভ্যাক্সিনকে এখনো অনুমোদন দেয়নি।

অবস্থা যখন এমন, তখন যদি খবর পাওয়া যায় এক নতুন ভ্যাক্সিন আসতে চলেছে, যা ডেঙ্গুর চারটে সেরোটাইপের ওপরেই সমান ভাবে কার্যকর, তাহলে?

হ্যাঁ সেই সুখবরই সম্প্রতি পাওয়া গেছে, Nature পত্রিকায় প্রকাশিত এক আর্টিকলে। Johnson & Johnson কোম্পানি, KU Leuven Rega Institute এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এমনই এক ভ্যাক্সিন তৈরির সাফল্যের কথা ঘোষণা করেছে ও প্রিক্লিনিক্যাল ডেটাও প্রকাশ করেছে।

এই নতুন ভ্যাক্সিনের বিশেষত্ব হলো এর MOA বা মোড অফ একশান। এই ভ্যাক্সিনটি NS3 ও NS4B নামে ডেঙ্গু ভাইরাসের দেহের মধ্যেকার দুটো প্রোটিনের কাজ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে, ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি কমে বা বন্ধ হয়ে যায়।

যদিও ভ্যাক্সিনটি এখনো পশুদের ওপরে পরিক্ষা নিরীক্ষার স্তরে আছে, বিশেষজ্ঞরা তিনটি কারণে এই নতুন ভ্যাক্সিন সম্বন্ধে অত্যন্ত আশাবাদী।

এক, এর অনন্য কার্য্য পদ্ধতি বা ইউনিক মোড অফ একশান।

দুই, ডেঙ্গুর চার রকমের সেরোটাইপের ওপরেই এর কার্যকারিতা আর,

তিন, দেখা গেছে যে, শুধু প্রতিরোধ নয়, ডেঙ্গু রোগীর ওপরেও এর কার্যকারিতা চমকপ্রদ।

আশা করা যায় আর কিছুদিনের মধ্যেই এই ভ্যাক্সিন জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য পাওয়া যাবে এবং বহু মানুষ এই ভয়ানক রোগ থেকে মুক্তি পাবে।

ঋনস্বীকার:

1.The American Journal of Tropical Medicine.

2. News bulletin, KU Leuven Rega Institute, Beerse, Belgium

3. Nature

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb