গণকযন্ত্রের জনক ব্লেজ পাস্কাল

লেখক - বিকাশ মণ্ডল

ছেলেটির বাবা ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর। সে বাবাকে প্রায়দিনই  রাত জেগে হিসেবনিকেশ করতে দেখেছে। ট্যাক্সের হিসেব বলে কথা! এক পয়সারও এদিকওদিক হবার জো আছে?  তাই হিসেব মেলানোর জন্য একই যোগবিয়োগের কাজ একাধিকবার করতে হতো। কতবার সে নিজেই বাবাকে এই কাজে সাহায্য করেছে।  বহুবার সে ভেবেছে কী করে এমন ক্লান্তিকর, কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ কাজের হাত থেকে  পিতাকে অব্যাহতি দেওয়া যায়। কিন্তু কীভাবে? সে ঠিক  করল এমন একটি যন্ত্র  সে আবিষ্কার করবে যার দ্বারা গণনার কাজ  সহজে নির্ভুলভাবে করা যাবে। তাহলেই তার পিতার কষ্ট লাঘব হবে। তিন বছর ধরে নিরলস চেষ্টার পর যখন তার বয়স মাত্র ঊনিশ বছর তখন সত্যি   সত্যিই সে একটি গণকযন্ত্র আবিস্কার  করল যা পরবর্তীকালে তার নামানুসারে ‘পাস্কালাইন’ নামে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করল। ছেলেটির পদবি ছিল ‘পাস্কাল’ এবং সেখান থেকে ‘পাস্কালাইন’। বলা যায় পাস্কালই হলেন যান্ত্রিক গণকযন্ত্রের জনক।

                                

        

এই অসাধারণ প্রতিভাধর ছেলেটির পুরো নাম ব্লেজ পাস্কাল(Blaise Pascal)। পরবর্তীকালের বিশ্ববিখ্যাত গণিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক।

                                  

আজ থেকে প্রায় 400 বছর আগে  ফ্রান্সের ক্লেমণ্ট(Clermont) শহরে ব্লেজ পাস্কালের জন্ম। পিতা এটিয়েন(Etienne Pascal) পাস্কাল ছিলেন ট্যাক্স কালেক্টর ও গণিতানুরাগী। মাতার নাম অ্যান্তোনেট বিগন(Antoinette Begon)। পাস্কালের বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন তাঁর মা পরলোক গমন করেন। পিতা এটিয়েন দ্বিতীয়বার আর বিবাহ করেননি। তিন ছেলেমেয়ে-  পাস্কাল, গিলবার্তে(Gilberte) ও জ্যাকেলিন(Jacqueline)-এর দেখাশুনার জন্য তিনি একজন পরিচারিকা  রেখেছিলেন। পাস্কালের যখন সাত বছর বয়স তখন তাঁর পিতা তাঁদেরকে নিয়ে ক্লেমণ্ট ছেড়ে প্যারিসে চলে আসেন। জন্ম থেকেই ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী পাস্কাল ছিলেন বিস্ময়কর বুদ্ধিসম্পন্ন। মাত্র ষোল বছর বয়সে কারো সাহায্য ছাড়াই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ‘ত্রিভুজের তিনটি কোণের যোগফল দুই সমকোণের সমান‘, যা তাঁর পিতাকে অসীম আনন্দ দিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন যে তিনি এক  গণিতজ্ঞ পুত্রের জন্ম দিয়েছেন। এই ঘটনার পর তিনি পাস্কালকে ইউক্লিডের লেখা ‘এলিমেন্টস’ গ্রন্থটির একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন। এই সময়ে পাস্কাল তাঁর বিখ্যাত “Mystic Hexagram” উপপাদ্যের কথা বলেন। এই উপপাদ্যে বলা হয়েছে যে,

’ যদি একটি শঙ্কুচ্ছেদের ওপর যেকোনো ছটি বিন্দু নিয়ে বিন্দুগুলিকে সরলরেখাংশ দ্বারা যোগ করে একটি ষড়ভুজ অঙ্কন করা হয়, তবে ষড়ভুজের তিন জোড়া বিপরীত বাহু তিনটি বিন্দুতে ছেদ করবে যারা  একই সরলরেখায় অবস্থিত হবে।‘

                      

  বর্তমানে এটি ‘পাস্কালের উপপাদ্য’ নামে পরিচিত।

গণিতে তাঁর আর এক উল্লেখ যোগ্য আবিস্কার হল ‘সংখ্যার ত্রিভুজ’ যা তাঁর নামানুসারে ‘পাস্কালের ত্রিভুজ সূত্র’ নামে পরিচিত। কোনো দ্বিপদ রাশির বিস্তৃতিতে দ্বিপদ সহগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই সূত্র ব্যবহার করা যায়।

                                                 

এছাড়া ‘সম্ভাবনা তত্ত্বে(Probability Theorem)’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর আবিষ্কৃত সূত্র “পাস্কালের চাপ সূত্র” নামে বিখ্যাত। এই সূত্রে বলা হয়েছে- ‘স্থির তরলের কোনো অংশে চাপ প্রয়োগ করলে তরল সেই চাপ অপরিবর্তিত মানে সর্বদিকে সঞ্চারিত করে।‘

            

তাঁর এই সূত্রের ওপর নির্ভর করে হাইড্রলিক প্রেস তৈরি করা হয়েছে।

তিনিই সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে শূন্যস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

                               

তাঁর এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে ‘ইঞ্জেক্সান সিরিঞ্জ’ বা ‘ভ্যাকিউম টিউব’ তৈরি সম্ভব হয়েছে।  

1651 সালে পিতার মৃত্যুর পর পাস্কাল বিজ্ঞানের জগত ছেড়ে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করেন। 1658 সালে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পরেন। অবিরাম অসহ্য মাথার যন্ত্রণা তাঁর অনিদ্রার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ চার বছর রোগভোগের পর 19 শে আগস্ট, 1662 সালে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে এই মহান গণিতজ্ঞ-বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হয়। তাঁর সম্মানার্থে চাপের এককের নামকরণ করা হয়েছে ‘পাস্কাল’। 

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

পোড়োদের পাতা


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb