এম্প্যাথেটিক্ মিরার্ নিউরোন

লেখক - দিগন্ত পাল

অপরকে হাই তুলতে দেখে আপনারও কি হাই ওঠার উপক্রম হয়? যদি আপনার এই স্বভাব নাও থাকে, পরিচিতদের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন, অনেকেই নিজের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্য করে থাকবেন। গাড়িতে বসে ঘুমানোর বদ্-অভ্যাস থাকায় আমি সবসময় গাড়ির চালকের পাশে বসাকে এড়িয়ে চলি। আমরা কখনও বৈজ্ঞানিকভাবে ভেবে দেখেছি যে কেন রোম্যান্টিক চলচ্চিত্র বা পার্টি ভিডিও সং এত বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় যদিও চলচ্চিত্রে বা ভিডিও সং-এ দর্শক রোম্যান্স বা পার্টি করার সুযোগ পান না? কেন অনেক ক্ষেত্রেই অপরকে কাঁদতে দেখে বা অপরের দুঃখে আমাদেরও খারাপ লাগে? ধর্মগ্রন্থসমূহে মানুষকে অন্যান্য জীব ও আর পাঁচজন মানুষের প্রতি সহমর্মিতার উপদেশ দেওয়া হয় – অপরের আনন্দকে অনুভব করা, অপরের দুঃখকে ভাগ করে নেওয়া – মদ্যা ব্যাপার হলো যে, অপরের মানসিক অবস্থাকে নিজের মস্তিষ্কে অনুভব করা। অপরের মানসিক অবস্থাকে নিজের মস্তিষ্কে অনুভব করার ক্ষমতা হলো “এম্প্যাথি” যা সাধারণত সকল মানুষের মধ্যে কম-বেশী থাকলেও তাকে আরও বাড়িয়ে নেওয়া যায়। সকল বিজ্ঞানী একমত না হলেও অনেক বিজ্ঞানীর মতে, মস্তিষ্ক বিদ্যমান এমন যে কোন প্রাণীর মধ্যে এই “এম্প্যাথি”-র একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো – মস্তিষ্ক যে অজস্র স্নায়ুকোষ বা নিউরোন নিয়ে গঠিত, তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ প্রকার স্নায়ুকোষ যার নাম “এম্প্যাথেটিক্ মিরার্ নিউরোন”, সংক্ষেপে “মিরার্ নিউরোন” বা “মিরার্ স্নায়ুকোষ” যারা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে।

নামকরণের যথার্থতা

ম্যাকাক্ বানরদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে; কোন বানর কোন কাজ করলে কিংবা অন্য কোন বানরকে বা মানুষকে সেই একই কাজ করতে দেখলে, উভয় ক্ষেত্রেই বানরটির মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুকোষ উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। বহু বিজ্ঞানীর মতে বানরের ঐ স্নায়ুকোষগুলি “মিরার্ স্নায়ুকোষ”-র উদাহরণ যারা নিজে করা ও দেখার মধ্যে পার্থক্যটুকু কিছুটা ঘুচিয়ে দেয়। এই স্নায়ুকোষগুলির সাহায্যে একজনের মস্তিষ্কের অনুভূতি আরেকজনের মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয় কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে, একজনের মস্তিষ্কের কোন নির্দিষ্ট অংশের উত্তেজনা আরেকজনের মস্তিষ্কের একই অংশে “ভার্চুয়াল রিয়ালিটি”-র ন্যায় সিমুলেটড্ হয় বলে এই স্নায়ুকোষের নামে “মিরার্” অর্থাৎ “দর্পণ” বা “আয়না” শব্দটির ব্যবহার হয়।

মানুষে-মানুষে পারস্পরিক ধারণা অর্জনে মিরার্ স্নায়ুকোষের ভূমিকা

আমাদের চলাফেরা বা অঙ্গভঙ্গি বা বিভিন্ন আবেগ সংক্রান্ত মুখভঙ্গি – এই সকলই  মস্তিষ্কের প্রিমোটর কর্টেক্স ও ইন্ফিরিয়র্ প্যারাইটাল কর্টেক্স অংশের স্নায়ুকোষগুলি পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন করে এবং কাজগুলি ঠিক কিভাবে সংঘটিত হবে তার পরিকল্পনা করে। যখন আমরা কোন বস্তুর দিকে এগিয়ে যাই ও তাকে ধরি কিংবা এগিয়ে গিয়ে বস্তুটিকে ঠেলি বা টানি কিংবা কোন মুখভঙ্গি করি – প্রত্যেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের উপরোক্ত দুটি অংশের ভিন্ন ভিন্ন স্নায়ুকোষের দলকে উদ্দীপিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। ঐ স্নায়ুকোষের দল এরপর প্রাইমারী মোটর কর্টেক্স-র কিছু স্নায়ুকোষকে উদ্দীপিত করে এবং তারপর প্রাইমারী মোটর কর্টেক্স-র উদ্দীপিত স্নায়ুকোষগুলি নির্দিষ্ট পেশীগুলিতে পরপর কতগুলি ঝাঁকুনি বা সংকোচনের মাধ্যমে আমাদের মুখভঙ্গি বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চলন ঘটায়।

যখন আমরা উপরোক্ত কাজগুলি নিজে না করে কাউকে ঐ কাজগুলি করতে দেখি, তখন প্রিমোটর কর্টেক্স ও ইন্ফিরিয়র্ প্যারাইটাল কর্টেক্স-র পূর্বোক্ত স্নায়ুকোষের দলগুলির সকল স্নায়ুকোষের বদলে কেবল মিরার্ স্নায়ুকোষগুলি উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। প্রিমোটর কর্টেক্স ও ইন্ফিরিয়র্ প্যারাইটাল কর্টেক্স-র মিরার্ স্নায়ুকোষগুলি আমাদের মস্তিষ্ককে নিজেদের আর বাকি মানুষদের কথা বলা, কাজ-কর্ম, ও আবেগের বহিঃপ্রকাশের ভঙ্গিমা বুঝতে; সেগুলিকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে; ও সেগুলি তুলনা করতে সাহায্য করে। এই কারণে বলা যেতে পারে, মিমিক্রি আর্টিস্ট বা অনুকরণ শিল্পীদের দক্ষতা নিহিত থাকে মূলত প্রিমোটর কর্টেক্স ও ইন্ফিরিয়র্ প্যারাইটাল কর্টেক্স-র মিরার্ স্নায়ুকোষগুলিতে !

                       মানুষের ইন্ফিরিয়র্ প্যারাইটাল কর্টেক্স

ভাষা মিরার্ স্নায়ুকোষ

আমাদের মস্তিষ্কের “ব্রকাস্ এরিয়া” অংশটি ভাষা শেখা ও ভাষা ব্যবহারে বিশেষভাবে সাহায্য করে। মজার বিষয় হলো এই যে, এই অংশেও কিছু মিরার্ স্নায়ুকোষ পাওয়া যায় ! ব্রকাস্ এরিয়া-র মিরার্ স্নায়ুকোষ যেমন ভাষা শেখায় সাহায্য করে, তেমনি একাধিক ভাষার ব্যবহার ও ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কথোপকথন প্রসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে এক ভাষা থেকে অপর ভাষায় শব্দের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ভাষার বিবর্তনেও মিরার্ স্নায়ুকোষের ভূমিকা থাকতে পারে !