হিলিয়ামের হাল হকিকত

লেখক - পঞ্চানন মণ্ডল

                                             

ছোটবেলায় শুনেছিলাম বেলুনে করে নাকি আকাশে ওড়া যায়।সেই বেলুনে একটা খুব হাল্কা গ্যাস ভরা থাকে। সবচেয়ে হাল্কা গ্যাস হলো হাইড্রোজেন। তাই ভেবেছিলাম হাইড্রোজেন ভরা থাকে! পরে ক্লাসের বইতে পড়েছি হাইড্রোজেন নয়, বেলুনে হিলিয়াম ভরা থাকে।তবে গ্রামের মেলাতে যে গ্যাস বেলুন বিক্রি হয় তাতে কিন্তু হিলিয়াম নয় হাইড্রোজেন ভরা থাকে! তাই মাঝে মাঝে বিস্ফোরণ জনিত দুর্ঘটনার খবর আসে। উল্টে হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় মৌল, তাই এই গ্যাস ভরা পুরো নিরাপদ।

এই হিলিয়াম গ্যাসের কল্যাণে বেলুনে করে আকাশে উড়ে বেড়াতে পারে মানুষ।বহু মানুষ বেলুনে চড়ে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছে, অনেকে চেষ্টা চালিয়েছে। কেউ কেউ ব্যর্থ হলে অনেকের স্বপ্ন সার্থক হয়েছে । বর্তমানে নানা কাজে এই বেলুন ব্যবহার হচ্ছে। আস্ত একটা বাড়ি বেলুনের সঙ্গে উড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে!তোমরা অনেকেই অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘আপ’ দেখেছো।তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক প্রয়াস চালিয়েছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল। তাদের হাউ হার্ড ক্যান ইট বি অনুষ্ঠানের জন্য একটি বাড়িসুদ্ধ আকাশে ওড়ার পরিকল্পনা করেছিল তারা। শেষমেষ  ১০ হাজার ফুট ওপরে  তাঁরা প্রায় এক ঘণ্টা কাটিয়েছেন।বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন,স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও চাপে এক ঘনফুট আয়তনের হিলিয়াম গ্যাস প্রায় ৩০ গ্রাম ওজন বহন করতে সক্ষম। তুমি যদি বেলুনে চড়ে আকাশে পাড়ি দিতে চাও, তবে আপ দেখানো বেলুনের মতো  কয়টি হিলিয়াম বেলুন লাগবে তা হিসাব করে দেখতে পারো।

কারা নিষ্ক্রিয় গ্যাস 

মাধ্যমিক স্তরের বইতে পড়েছো 'যে সব গ্যাসীয় মৌল রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় অর্থাৎ অন্য কোনো মৌলের সাথে সংযুক্ত হয় না, এমনকি নিজেদের মধ্যেও সংযুক্ত হয় না, সর্বদা এক পরমাণুক (monoatomic) অবস্থায় থাকে তারা নিষ্ক্রিয় গ্যাস (Noble Gas) ।তোমরা জানো নিষ্ক্রিয় গ্যাস মোট ৭টি।  হিলিয়াম (He), নিয়ন (Ne), আর্গন (Ar), ক্রিপ্টন (Kr), জেনন (Xe), রেডন (Rn) এবং ওগানেসন (Og)। সাধারণ অবস্থায় এগুলো বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং এক পরমাণুক গ্যাস।

নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি কেন নিষ্ক্রিয়

নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির ইলেকট্রন বিন্যাস তোমরা যদি লক্ষ্য করো দেখবে হিলিয়াম ব্যতীত অন্য নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে অষ্টক পূর্ণ থাকে। নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহের সর্বশেষ শক্তিস্তরে অষ্টক পুর্ণ থাকায় নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ যথেষ্ট স্থিতিশীল থাকে। ফলে এসব মৌল সমূহ সহজে কোন বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না। সর্ববহিঃস্থ স্তরে ইলেকট্রন দ্বারা অষ্টক পূর্ণ থাকায় এরা অত্যন্ত সুস্থিত। এ সুস্থিত ইলেকট্রন বিন্যাস ভাঙ্গতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ অন্য কোন মৌলের সাথে যুক্ত হয় না।অর্থাৎ বহিঃস্থ স্তরে সুবিন্যাস্ত ইলেকট্রন বিন্যাসের কারণে নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ নিষ্ক্রিয় হয়।আর হিলিয়ামের ক্ষেত্রে সর্ববহিঃস্থ স্তরে দুইটি ইলেকট্রন পূর্ণ থাকে।

হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস

আধুনিক পর্যায় সারণীর প্রথম পিরিয়ড ও ১৮ গ্রুপ তথা নিষ্ক্রিয় মৌলের (noble elements) গ্রুপের অন্যতম মৌল এটি।মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণিতে এটি ৮ নম্বর গ্রুপে ছিল।অন্যা নিষ্ক্রিয় মৌলের ন্যায় হিলিয়াম ও একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিষ্ক্রিয় গ্যাস।এর পারমাণবিক সংখ্যা ২ ও ভরসংখ্যা ৪ । বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অল্প বিস্তর হিলিয়ামেরও অস্তিত্ব রয়েছে।এটি দ্বিতীয় হালকা মৌল। হাইড্রোজেনের পরেই।

হিলিয়াম নিস্ক্রিয় মৌল, তাহলে এটা তৈরি হলো কীভাবে

তোমরা হয়তো অনেকে জানো না, কোনো  মৌল পরমাণু পৃথিবীতে রাসায়নিক বিক্রিয়াতে তৈরি হয় নি। রাসায়নিক বিক্রিয়াতে যৌগ বা অণু তৈরি হয়। মৌল তৈরি হয় ফিউশন ও ফিশন থেকে। বিগ ব্যাং এর সময় কিছু মৌল তৈরী হয়েছিল তা মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম।  পরবর্তীতে সুপারনোভার মতো জায়গায় অন্যান্য মৌলগুলো তৈরী হয় ও সমগ্র গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণভাবে কোনো মৌল যত ভারী হয় তত সেটা মহাবিশ্বে দুর্লভ হয়। যখন মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমে কিছু হাইড্রোজেন মেঘ আস্তে আস্তে একত্র হতে শুরু করেছিল , মহাকর্ষীয় বলে তা সংঘর্ষ করে সৃষ্টি করেছে নক্ষত্রের। আর নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে শক্তি। এই শক্তির জ্বালানি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে হিলিয়ামে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিলিয়াম। হিলিয়াম থেকে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে আরও ভারী মৌল তৈরি হতে পারে।আর জেনে রাখো এই ফিউশনের মাধ্যমে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হওয়া সবচেয়ে সহজ। এ জন্য মহাবিশ্বে হাইড্রোজেনের পর সবচেয়ে বেশি রয়েছে হিলিয়াম। মহাবিশ্বের ৯০ শতাংশ পদার্থ হাইড্রোজেন, আর হিলিয়াম আছে ৭ শতাংশ। বাকি সব পদার্থ অন্য মৌলদের নিয়ে। হিলিয়াম সেই হিসেবে মহাবিশ্বে দুর্লভ নয়।

তাহলে পৃথিবীতে হিলিয়াম কেন দুর্লভ

সেটার মূল কারণ হিলিয়াম অত্যন্ত হালকা আর এর আন্তঃ আণবিক টান খুব কম।তাই হিলিয়াম বায়ুমন্ডলের অন্য গ্যাসগুলোর চেয়ে  প্রতিদিন বেশ কিছুটা করে মহাকাশে ফিরে যায়।তবে চরম অবস্থায় কিছু হিলিয়ামেরও কিছু যৌগ তৈরী হতে পারে। আর পৃথিবীতে হিলিয়ামের উৎস মূলত কিছু তেজস্ক্রিয় মৌল। যেগুলো থেকে আলফা পার্টিকেল বা হিলিয়াম আয়ন বের হয়।

কীভাবে জানা গেল হিলিয়ামের অস্তিত্ব

সেটা ১৮৮৬ সাল।পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ চলছিল। পিয়েরে জনসন (Pierre Janssen, ১৮২৪-১৯০৭) নামে ফ্রান্স জ্যোতির্বিদ সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সৌর বর্ণালী পর্যবেক্ষণের সময় তিনি বর্ণালীতে এমন কিছু দেখতে পান যা একদমই অচেনা । বর্ণালীরেখার একটি অংশ পূর্বে আবিষ্কৃত  কোনো মৌলের বর্ণালীর সাথে মেলে না।এই বর্ণালী এমন এমন কোনো মৌলের ইঙ্গিত দিচ্ছে হয়তো তার কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। অন্তত তখন পর্যন্ত এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানতো না। তার মানে অবশ্যই এটা নতুন কোনো মৌল। উল্লেখ্য বর্ণালীরেখা বিশ্লেষণ করলে কোনো নক্ষত্র কী দিয়ে তৈরী তা জানা যায়। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই অনেক দূরের কোনো বহির্জাগতিক গ্রহ-নক্ষত্র কী কী উপাদান দিয়ে তৈরি তা জানা গেছে।

পিয়েরে জনসনের এই পর্যবেক্ষণের পর তা স্বতন্ত্র একটি মৌল হিসেবে চিহ্নিত হয়।আগেই তোমাদের বলেছি, তখন পর্যন্ত পৃথিবীতে এর উপস্থিতি সম্পর্কে কেউ  জানত না, তাই একে বলা হতো বহির্জাগতিক মৌল (extraterrestrial element) । অনেকটা এইচ. জি. ওয়েলসের সায়েন্স ফিকশনের মতো,যেখানে তোমরা পড়েছো মঙ্গল গ্রহ থেকে এমন কিছু প্রাণী এসে পৃথিবীকে আক্রমণ করে যাদের দেহ যে মৌল দিয়ে গঠিত তা পৃথিবীতে আমাদের আধুনিক পর্যায় সারণীর কোনো মৌলের সাথে মিল ছিল না।

অনেকে বলেন বিশেষ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য সেই সুদূর ফ্রান্স থেকে ভারতে এসে পিয়েরে জনসন সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন  (তবে পিয়েরে ভারতে এসেছিলেন কিনা তা নিয়ে দ্বিমত আছে)।তখন বর্ণালীর হলুদ রঙের কাছে ৫৮৭.৪৯ ন্যানোমিটার অঞ্চলে ঐতিহাসিক এই ব্যতিক্রমটি দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে একে সকলেই সোডিয়ামের বর্ণালী বলে ভুল করবে।কারণ সোডিয়ামের বর্ণালী এই অঞ্চলেই থাকে এবং দেখতেও অনেকটা এরকমই। কিন্তু পিয়েরের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দ্বারা তিনি পার্থক্যটা ঠিক ধরতে পেরেছিলেন।

হিলিয়াম নাম হলো কীভাবে  

পিয়েরের শনাক্ত করা বর্ণালীটি তখন পর্যন্ত পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ জোসেফ  নরম্যান লকইয়ার (Joseph Norman Lockyer, ১৮৩৬-১৯২০)  ও রসায়নবিদ স্যার এডওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড (Edward Frankland)পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন এটি একটি স্বতন্ত্র মৌল।কিন্তু  মৌল হলেও এর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। তাই নামকরণও সেভাবেই করা হয়। সূর্যে এই মৌলের অস্তিত্ব আছে বলে সূর্যের নামের সাথে মিলিয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে হিলিয়াম। গ্রিক শব্দ হিলিয়স (helios) থেকে হিলিয়াম (Helium) শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীন গ্রিকরা সূর্যকে দেবতা বলে মনে করতো এবং সূর্যকে হিলিয়াস বলে ডাকতো।তাই এই নামকরণ।

পৃথিবীর পরিবেশে হিলিয়াম আছে কীভাবে জানা গেল

আবিস্কারের পর অনেক বছর ধরে মনে করা হতো পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব নেই। তবে আর যাই হোক, বহির্জাগতিক একটি মৌল আছে এবং পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব নেই, এরকম তথ্য বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে।তাঁরা ভাবলেন পৃথিবীতে আরো ভালো করে এই মৌল খুঁজে দেখা দরকার।আর খুঁজতে খুঁজতে  ১৮৯৫ সালে রসায়নবিদ স্যার উইলিয়াম র‍্যামসে ( Sir William Ramsay) ক্লিভিট খনিজ (cleveite) পর্যবেক্ষণ করার সময় ব্যতিক্রমী একধরনের মৌলের সন্ধান পান। তিনি এর নমুনা রসায়নবিদ উইলিয়াম ক্রুকস ও নরমান লকইয়ারের কাছে পাঠিয়ে দেন। এইদিকে লকইয়ার আগেই সূর্যের হিলিয়ামের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন এবং নামকরণ করেন। তার কাছে হিলিয়াম তেমন অপরিচিত নয়। খনিজ থেকে পাওয়া নমুনাটি সূর্যের বর্ণালীত্র পাওয়া নমুনার সাথে মিলে যায়। এর সাহায্যে বহির্জাগতিক মৌলটি পৃথিবীর স্বাভাবিক মৌলে পরিণত হয়!আর সেটিই হিলিয়াম।

হিলিয়ামময় মহাবিশ্ব

ধারণা করা হয়, হিলিয়াম মহাবিশ্বের মোট  ভরের প্রায় ২৩ শতাংশ গঠন করে আর মহাবিশ্বে হাইড্রোজেনের পরেই এর স্থান। হিলিয়াম নক্ষত্রগুলিতে ঘনীভূত হয়, যেখানে এটি হাইড্রোজেন থেকে নিউক্লিয়ার ফিউশন দ্বারা সংশ্লেষিত হয়। যদিও হিলিয়াম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে শুধুমাত্র ০.০০০৫ শতাংশ মাত্র পাওয়া যায় এবং আরো  অল্প পরিমাণে তেজস্ক্রিয় খনিজ, উল্কাপিণ্ড এবং খনিজ স্প্রিংসে পাওয়া যায়।তবুও মহাবিশ্বে হিলিয়াম দুর্লভ নয়।

হিলিয়ামের আইসোটোপ

প্রতিটি হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে দুটি প্রোটন থাকে আর এর আইসোটোপ গুলিতে নিউট্রন সংখ্যা আলাদা হওয়ার জন্য ভরসংখ্যা আলাদা হয়।আইসোটোপ বা সমস্থানিক এর সংজ্ঞা মনে পড়ে যাচ্ছে! তসি তো!!তা ভালো! হিলিয়ামের পরিচিত আইসোটোপে ১ থেকে ৬ টি নিউট্রন থাকে, তাই তাদের ভরসংখ্যা ৩ থেকে ৮ পর্যন্ত হয়।  এই ৬ টি আইসোটোপের মধ্যে, শুধুমাত্র যাদের ভর সংখ্যা তিন (হিলিয়াম-3, বা 3He) এবং ৪ (হিলিয়াম-4 বা 4He) তারা স্থিতিশীল;বাকি সবগুলোই তেজস্ক্রিয়, খুব দ্রুত ক্ষয় হয়ে অন্য পদার্থে পরিণত হয়।  পৃথিবীতে উপস্থিত হিলিয়াম কোনো আদি উপাদান নয়, সেগুলো তেজস্ক্রিয় ক্ষয় দ্বারা উত্পন্ন হয়েছে  ভারী তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত আলফা কণা হল আইসোটোপ হিলিয়াম-4 এর নিউক্লিয়াস। আগেই তোমাদের বলেছি হিলিয়াম বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে জমা হয় না কারণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল মহাকাশে ধীরে ধীরে হিলিয়াম মিলিয়ে যাওয়া রোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। পৃথিবীতে আইসোটোপ হিলিয়াম-3 বিরল। হাইড্রোজেন-3 আইসোটোপের (ট্রিটিয়াম) ঋণাত্মক বিটা ক্ষয় এর জন্য দায়ী।  হিলিয়াম-4 এখন পর্যন্ত তুলনামূলক স্থিতিশীল তাই হিলিয়াম আইসোটোপগুলির মধ্যে এটি সর্বাধিক পাওয়া যায়।  হিলিয়াম-4 পরমাণু হিলিয়াম-3-এর তুলনায় বায়ুমণ্ডলীয় হিলিয়ামে প্রায় ৭০০০০:১ মাত্র!  কিছু হিলিয়াম-বহনকারী খনিজে সেই অনুপাত আরো কম,  প্রায় ৭০০০০০০:১ ।

হিলিয়াম এই যে গ্যাস বেলুনে ভরা হচ্ছে, তৈরি করা হচ্ছে কীভাবে

ভালো প্রশ্ন! হিলিয়াম গ্যাস যা বেলুনে ভরা হয় (৯৮.২ শতাংশ বিশুদ্ধ) তা কম তাপমাত্রায় এবং উচ্চ চাপে বায়ুর অন্যান্য  উপাদানগুলিকে তরল করে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। শীতল, সক্রিয় চারকোল অন্যান্য গ্যাসের শোষণ থেকে ৯৯.৯৯৫  শতাংশ বিশুদ্ধ হিলিয়াম পাওয়া যায়। কিছু হিলিয়াম বৃহৎ পরিসরে বাতাসের তরলীকরণ থেকেও পাওয়া যায়।ঘরের তাপমাত্রায় ও স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে, ৯০ মেট্রিক টন বাতাস থেকে প্রাপ্ত হিলিয়ামের পরিমাণ প্রায় ১১২ ঘনফুট বা ৩.১৭ ঘন মিটার।

হিলিয়াম যৌগ কী আদৌ সম্ভব

হিলিয়াম নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি নিষ্ক্রিয়। অন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস গুলো  উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রায় কিছু বিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে কিন্তু  হিলিয়াম তেমন মৌল নয়! বহু বছর ধরে হিলিয়াম ফ্লোরাইড বানানোর চেষ্টা চলছে তবে তা বাস্তবায়ন হয় নি। তবে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরী করে বিশেষ ব্যবস্থায়  হিলিয়াম যৌগ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা ফুলারিনের মধ্যে হিলিয়াম পরমাণু আটকে ফেলেছেন ।তোমরা ফুলারিনের নাম শুনেছো। ফুলারিন হলো কার্বনের একটা বিশেষ রূপভেদ । ৬০ থেকে ৭০ বা আরও বেশি কার্বন পরমাণু যুক্ত হয়ে ফুটবলের ন্যায় গঠন  তৈরি করে। ভেতরটা তার ফাঁপা। আর ওই ফাঁপা জায়গায় আটকে থাকে হিলিয়াম ।তবে এভাবে যা তৈরি হয় বুঝতেই পারছো ,তাকে ঠিক পরিচিত যৌগ বলা যায় না।

তবে ২০১৬ সালে এক গবেষণায়  সোডিয়াম-হিলিয়ামের এক যৌগ ডাইসোডিয়াম হিলাইড ( Disodium helide -Na2He) বানানো সম্ভব হয়েছে।  পৃথিবীর কেন্দ্রের চাপের মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ চাপ (১১৩ গিগা পাস্কাল বা ১১৩০০০০ বার! ) সৃষ্টি করলে এ যৌগ তৈরি হয়। এ যৌগ মোটামুটি সুস্থিত।

কী কী কাজে লাগে হিলিয়াম

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হিলিয়াম বিরল হলেও এই গ্যাস আমাদের খুব কাজের জিনিস।

  • হিলিয়াম গ্যাস হালকা ও অদাহ্য হওয়ায় ভরা হয়। উড়োজাহাজের টায়ার স্ফীত করার কাজে ব্যবহার করা হয়।
  •  ডুবুরিরা শ্বাসকার্যে ব্যবহারের জন্য 20% অক্সিজেন ও 80% হিলিয়াম গ্যাসের মিশ্রণ ব্যবহার করেন।
  • হিলিয়াম ও অক্সিজেন গ্যাসের মিশ্রণ হাঁপানি রোগের চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।
  • গবেষণার জন্য নিষ্ক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
  • কম তাপমাত্রায় গবেষণার জন্য গবেষণাগারে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
  • প্রতিপ্রভ নলে নিয়ন গ্যাসের সাথে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
  • নিম্ন তাপমাত্রা পরিমাপে ব্যবহৃত গ্যাস থার্মোমিটারে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়।
  • অ্যালুমিনিয়ামের মতো ধাতু ঢালাইয়ের জন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়।

                                                   

সূচিপত্র

কল্পবিজ্ঞান

গল্পবিজ্ঞান

বিজ্ঞান নিবন্ধ

কল্পবিজ্ঞানের ছড়া


Copyright © 2011. www.scientiphilia.com emPowered by dweb