আকর্ষণীয়(য়া)

লেখক - দিগন্ত পাল

                                                                                                               চিত্রসূত্র – অন্তর্জাল

কথায় বলে – “আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী”। আবার একথাও প্রচলিত আছে যে – “Don't judge a book by its cover”। সত্যি কথা বলতে কি, প্রবাদের টানা-পোড়েনের ঊর্ধ্বে এই বিষয়টি একজন মানুষের নিতান্তই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে যে তিনি কোন ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা, বা বিষয়ের বাহ্যিক রূপ পর্যবেক্ষণ করবেন না তার ভেতরটা খতিয়ে দেখবেন; নাকি দুটোই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোন ব্যক্তির বাহ্যিক রূপ পর্যবেক্ষণ করে আমাদের মস্তিষ্কে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে উপলব্ধি জন্ম নেয় সেই উপলব্ধিতে একটি বিশেষ বিবেচনা প্রায়শই মিশে থাকে, তা হলো যে ব্যক্তিটি “আকর্ষণীয়” না “সাদামাটা” না “বিশ্রী”। আকর্ষণীয় ব্যক্তিকে বিশেষিত করার জন্য ইংরাজী ভাষায় বেশ কিছু শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায় যেমন – “হট্”,“হ্যান্ডসাম্”,”বিউটিফুল” ইত্যাদি। এখন যে প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজব তা হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কোন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় কিনা তা কিভাবে বিবেচনা করে ! আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন পুরুষকে “হট্” বা “হ্যান্ডসাম্” দেখাচ্ছে? কিসের ভিত্তিতে বড় পর্দায়, ছোট পর্দায়, ফ্যাশন্ ম্যাগাজিন বা গণ মাধ্যমে অভিনেত্রীদের “হট্” বা “বিউটিফুল” বিশেষণ দেওয়া হয়? আসলে এই বিষয়টি বিবেচিত হয় মানুষের মস্তিষ্কের স্বজ্ঞাত অঞ্চলে (ইন্টিউয়েটিভ পার্ট অফ ব্রেইন), তবে এই বিবেচনায় সমর্থ হওয়ার জন্য স্বজ্ঞাত অঞ্চলকে প্রস্তুতি নিতে হয় আর সেই প্রস্তুতিতে সাহায্য করে থাকে মস্তিষ্কের যৌক্তিক অঞ্চলটি (রাশানাল পার্ট অফ ব্রেইন)। অর্থাৎ সামনের মানুষটাকে আকর্ষণীয় বা আকর্ষণীয়া লাগছে কিনা অথবা ঘর থেকে বেরোনোর আগে সেজে গুজে আপনি যখন আয়নার সামনে দাঁড়ান, তখন আপনার নিজেকে সুদর্শন বা সুদর্শনা মনে হচ্ছে কিনা – এই ধরনের সকল সিদ্ধান্ত মস্তিষ্ক তার স্বজ্ঞার (ইন্টিউয়েশন্) সাহায্যে নেয়, আর মস্তিষ্কের যৌক্তিক অঞ্চলটি তার অর্জিত বিভিন্ন এই সম্পর্কিত ধারণা স্মরণ করে সেগুলি স্বজ্ঞাত অঞ্চলকে ক্রমাগত সরবরাহ করে ও সময়ের সাথে সাথে সেই স্বজ্ঞা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

মানুষের বাহ্যিক আকর্ষণীয়তার বিজ্ঞানকে বিশদে বুঝতে হলে মনুষ্য-মস্তিষ্কের “স্বজ্ঞাত অঞ্চল” ও “যৌক্তিক অঞ্চল”-কে আমাদের বুঝতে হবে, তবে সেগুলি বোঝার জন্য মনুষ্য-মস্তিষ্কের কিছু ভিত্তিগত বিষয় আমাদের প্রথমে জেনে ফেলতে হবে।

স্বল্প মেয়াদী স্মৃতি, মস্তিষ্ক-তরঙ্গ, মস্তিষ্কে সংগ্রীহিত তথ্যের বিশ্লেষণ:

আমাদের মস্তিষ্কের “সেরিব্রাল কর্টেক্স” কতগুলি খণ্ডে (লোব) বিভক্ত - “ফ্রন্টাল লোব”, “প্যারাইটাল লোব”, “অকিপিটাল লোব”, ও “টেম্পোরাল লোব” ।

               সেরিব্রাল কর্টেক্স-র প্রধান চারটি খণ্ড
 

অকিপিটাল লোবে অবস্থিত “ভিসুয়াল কর্টেক্স”-র কাছাকাছি রয়েছে একটি নিউরাল লুপ (নিউরাল লুপ হলো কতগুলি স্নায়ুকোষের সমষ্টি যারা কোন একটি নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য একটি ক্রমে সংযুক্ত থেকে স্নায়বিক উদ্দীপনাকে মস্তিষ্কের এক অংশ থেকে অন্য অংশে নিয়ে যায়) যা দৃষ্টি সম্বন্ধীয় তথ্যের (ভিসুয়াল ইনফরমেশন্) “স্বল্প মেয়াদী স্মৃতি”(শর্ট টার্ম মেমোরি) হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও একটি ফোনোলজিকাল নিউরাল লুপ আছে যা ফ্রন্টাল লোবে অবস্থিত “ব্রকাস্ এরিয়া”-র সাথে সম্মিলিতভাবে শব্দ ও ভাষা সম্বন্ধীয় তথ্যের (অডিও ইনফরমেশন্) “স্বল্প মেয়াদী স্মৃতি” হিসাবে কাজ করে। এই প্রসঙ্গে “স্বল্প মেয়াদী স্মৃতি” কি তা সহজ করে বলে দিই। আপনি এখন যে বাক্যটা পড়ছেন তার অর্থ বুঝতে গেলে বাক্যের শেষের দিকের অংশটা পড়ার সময় বাক্যের শুরুটাও আপনাকে মনে রাখতে হবে আর আপনার মস্তিষ্কের স্বল্প মেয়াদী স্মৃতিই এই কাজটা করে দেয় - অর্থাৎ অল্প সময়ের (১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড অথবা কখনও ১ মিনিট) জন্য অল্প কিছু তথ্য সে ধরে রাখে।

মানুষের মস্তিষ্ক অজস্র স্নায়ুকোষ (নিউরোন) এবং বেশ কিছু স্নায়ুকোষের সাহায্যকারী কোষ বা “গ্লিয়াল কোষ” নিয়ে তৈরি হয়। কতগুলি স্নায়ুকোষের একই সাথে অথবা একটি ক্রমে উদ্দীপিত হয়ে ওঠা “উপলব্ধি”-র (অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে লব্ধ অনুভূতি অথবা কিছু স্মরণ করা অথবা যুক্তি ভিত্তিক নতুন কোন ভাবনা অথবা স্বজ্ঞা ভিত্তিক কোন সিদ্ধান্ত অথবা কোন কল্পনা) পরিভাষা। হারমোনিয়ামের কিবোর্ড-র উপর বাদকের চঞ্চল আঙুলগুলো লক্ষ্য করবেন – কিভাবে আঙুলগুলো হারমোনিয়ামের কি-গুলিকে ছন্দবদ্ধভাবে আঘাত করে চলে। কখনও কখনও মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ুকোষ এরকম ছন্দবদ্ধভাবেও উদ্দীপিত হয়। ছন্দবদ্ধভাবে উদ্দীপিত হওয়ার সময় স্নায়ুকোষগুলির প্রত্যেকটি কিছুক্ষণ পর পরই  বারবার উদ্দীপিত হতে থাকে – স্নায়ুকোষগুলির উদ্দীপিত হওয়ার এই ছন্দকে “মস্তিষ্ক-তরঙ্গ” বলে যারা কম্পাঙ্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে।