রয়্যাল সোসাইটির ফেলো

লেখক - মানস প্রতিম দাস



একজন বিজ্ঞানীর জীবনে অনেকগুলো বিষয় তাঁর মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে। অসামান্য অবদানের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারের কদর এখনও সবথেকে বেশি। পরের ধাপে কোন পুরস্কার জায়গা পাবে তা চিহ্নিত করা কঠিন তবে বিশ্বখ্যাত কিছু সোসাইটির ফেলো হওয়া নিঃসন্দেহে সম্মানের। এর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটি। যতই বলা হোক যে কাজটাই বড় কথা, উপযুক্ত সম্মানে ভূষিত না হলে পূর্ণতা আসে না সফল বিজ্ঞানীর জীবনে। চিকিৎসক ও চিকিৎসা-গবেষক উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনেও কথাটা সত্যি। তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর অপ্রাপ্তির ক্ষেত্রগুলো, আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত না হওয়ার কষ্ট।

মনোনয়ন

১৯৪১ সালে রয়্যাল সোসাইটি যাঁদের ফেলো হিসাবে নির্বাচন করে তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী – হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। এই বছরেরই ২৩ জুন সোসাইটিতে জমা পড়েছিল অন্য এক বিশিষ্ট ভারতীয়র মনোনয়ন, তিনি উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। এই কাজে একজন প্রস্তাবক এবং সমর্থক থাকতে হয়, ইংরেজিতে বলা হয় প্রোপোজার এবং সেকেণ্ডার। প্রথম ভূমিকা পালন করেছিলেন স্যার জন লায়োনেল সাইমনসেন এবং সমর্থক হন মেঘনাদ সাহা। সাইমনসেনের সঙ্গে ভারতের যোগ ছিল বিস্তৃত, বিবিধ ভূমিকায় তাঁকে পেয়েছে এই দেশ। মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি পড়াতে আসেন ১৯১০ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তাঁকে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯১৪ সালে ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নেন তিনি। ১৯২৬ সাল অবধি এই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন সাইমনসেন। দেরাদুনের ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট অ্যাণ্ড কলেজের চীফ কেমিস্ট পদে তিনি ছিলেন ১৯১৯ থেকে ১৯২৫ অবধি। ব্যাঙ্গালোরের ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে অধ্যাপনা করেন ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত। এর পর দেশে ফিরে গিয়ে লণ্ডনের গাইজ হসপিটালে কাজ করেন সাইমনসেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৫২ – এই সময়টা তিনি কলোনিয়াল প্রোডাক্টস রিসার্চ কাউন্সিলের অধিকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৃতিজাত পদার্থের রসায়ন ছিল সাইমনসেনের কাজের ক্ষেত্র। রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ তিনি লাভ করেন ১৯৩২ সালে। মেঘনাদ সাহা রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হন ১৯২৭ সালে। অর্থাৎ সোসাইটির নিয়ম মেনে দু’জন ফেলোর সুপারিশ সহ পৌঁছল মনোনয়নপত্র। তবে একইসঙ্গে দেশী এবং বিদেশী আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী তাঁদের সমর্থনের স্বাক্ষর জুড়ে দিলেন মনোনয়নপত্রের সঙ্গে। ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন কে এস কৃষ্ণাণ (১৯৪০) এবং বীরবল সাহ্‌নি (১৯৩৬)। বিদেশিদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক ও পরজীবী-বিশারদ জন উইলিয়াম ওয়াটসন স্টিফেন্স (১৯২০), রসায়নবিদ ফ্রেডেরিক জর্জ ডোনান (১৯১১), ভূতাত্ত্বিক লুই লে ফার্মর (১৯৩৪), সামরিক বিভাগের চিকিৎসক রবার্ট বেরেসফোর্ড সিম্যুর সিওয়েল (১৯৩৪), জন চার্লস গ্রান্ট লেডিংহাম (১৯২১), রসায়নবিদ চার্লস স্ট্যানলি গিবসন (১৯৩১)। বন্ধনীতে প্রত্যেক বিজ্ঞানীর রয়্যাল সোসাইটিতে ফেলো হওয়ার সাল রয়েছে। এঁদের মধ্যে ডোনান গিবসন ও লেডিংহাম সাধারণভাবে জ্ঞাত তথ্য থেকে বা ‘ফ্রম জেনারেল নলেজ’ সমর্থন করেছিলেন মনোনয়ন। ডোনান বাদে প্রত্যেক বিজ্ঞানীরই ভারতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁরা জানতেন এদেশের অবস্থা এবং চিকিৎসা-গবেষণার চিত্রটা। এই পুরো উদ্যোগটা নিয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। আগের বছর অর্থাৎ ১৯৪০ সালেও তিনি চেষ্টা করেছিলেন সময়সীমার মধ্যে মনোনয়নপত্র পাঠানোর কিন্তু সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে নি নানা কারণে।   

অবদান

মনোনয়নপত্র পাঠানোর জন্য প্রার্থীর অবদান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে লিখতে হয় উপযুক্ত পরিসরে। কীভাবে সেটা লেখা হয়েছিল তা নিয়ে আলোচনার আগে স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক যে উপেন্দ্রনাথের অবদানের জায়গাটা কোথায়। এ নিয়ে তো কোনও দ্বিধা থাকতে পারে না যে কালাজ্বরের ওষুধ তৈরি করাই তাঁর সবথেকে বড় অবদান।