খুঁতো

লেখক - অবন্তী পাল

কফি-পটে এসপ্রেসো তৈরি করে ব্রেকফাস্ট টেবিলে রাখল মিডেনা। ঘড়িতে এখন সাতটা পঞ্চান্ন, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে টোস্ট তৈরি করে পরিবেশন করবে সপ্তককে। তার ঠিক আধঘন্টার মধ্যে প্রাতঃরাশ সেরে, সকালের শীর্ষ খবরে চোখ বুলিয়ে অফিসে রওনা দেবে সপ্তক। একটা বহুজাতিক ইলেকট্রনিক সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর সপ্তক দাশগুপ্ত।

আজকের দিনটা অন্যদিনের থেকে অনেকটা আলাদা। মানুষের বেশে রোবট সহায়িকা মিডেনা তার জীবনের প্রারম্ভ থেকে সপ্তকের ছায়ায় ঘুরছে। কিন্তু আজকের মতো অবস্থা এর আগে ওর কখনই হয়নি। সপ্তকের সামনে সসেজের ট্রে নামিয়ে রেখে বৃত্তাকারে খানিকটা নেচে নিল সে। সুবিশাল হলঘরের মেঝে শ্বেতপাথরের। হলঘরের ঠিক মাঝখানে লাল আর কালো পাথরের কাজ করা একটা নিখুঁত হেক্সাডেকাগন, ঠিক ফুলের আকারে। নিখুঁত পদক্ষেপে শুধুমাত্র পায়ের হ্যালাক্স স্পর্শ করে ফুলের প্রতিটি পাপড়িকে বৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করে ষোলোটি দিকের শীর্ষকে ছুঁয়ে গেল মিডেনা। তার গলা দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসির মতো একটা খলখল শব্দের অবতারণা হলো। হরিণগতিতে ঘরের একদম পুব কোণে চলে গেল সে। তেতাল্লিশ তলার দেওয়াল জোড়া কাঁচের জানলার বাইরে দেখা যাচ্ছে বিস্তৃত ব্যস্ত শহর। জনপদ মুখর কর্মব্যস্ত মানুষ আর রোবটদের যাতায়াত। তাদের ক্ষুদে অবয়ব এত উপর থেকে বড্ড অকিঞ্চিৎকর। বুঝি এ এক অন্য জাগতিক স্তর, মাটির স্পর্শ আর গন্ধের থেকে অনেক দূরে, কোন নরম পেঁজা তুলোর ফুরফুরে মেঘের দেশে। গুনগুন করে দুই কলি গান গেয়ে উঠল মিডেনা। তারপর সপ্তকের একেবারে কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,

"তুমি দু'মিনিট লেটে রান করছ বস্"

মুচকি হাসল সপ্তক। আজ তার ইচ্ছা পূরণের দিন, স্বাধীনতার দিন। আজ থেকে নিজেকে মামুলি পণ্য ভাবার দিন শেষ। ২১৮০'র দশকে দাঁড়িয়ে, সপ্তকের ষাটোর্ধ্ব নির্মেদ, সুঠাম চেহারার কৃতিত্ব দেওয়া যায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে, বিবর্তিত সমাজকে আর মানুষের বদলে যাওয়া চাহিদাকে। গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে, একটা মস্ত বড় বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবারের ধারণাটাই পরিমার্জিত হয়ে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। সরকারের নির্দেশে গঠিত বিশেষ 'মানব সম্পদ রক্ষা' আইনের জেরে পরিবারের সাংসারিক কাজকর্ম দেখভালের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে রোবো-সেবকদের হাতে। এই রোবো-সেবকেরা আদপে উন্নতমানের রোবট, যদিও বাইরে থেকে দেখতে তারা অবিকল মানুষের মতো। আগের যুগের যান্ত্রিক, কাঠ-পুত্তলিকা মার্কা চেহারা কবেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে সিলিকন বডি ব্যবহৃত হয়। মাথা আর হাতের তালু না দেখলে এদের পৃথকভাবে চেনা দুষ্কর। যেমনভাবে মানুষের ক্ষেত্রে বার্থ সার্টিফিকেট প্রযোজ্য হয় ঠিক তেমনভাবেই প্রতিটি রোবো-সেবকের সৃষ্টি, আপগ্রেড আর নষ্ট হওয়ার সমস্ত খুঁটিনাটি নথিভুক্ত থাকে সরকারের খাতায়। উপরন্তু, প্রত্যেক রোবো-সেবকের একটা করে বিশিষ্ট কোড থাকে যা মানুষের ডিএনএ পরিচয়পত্রের সমান। বলা যেতে পারে, এই দিনে দাঁড়িয়ে মানুষ আর রোবো-সেবক উভয়েই বিশ্বনাগরিক। যেখানে প্রতিটি ফ্যামিলি ইউনিট নথিভুক্ত, সেখানেই একটি করে রোবো-সেবক বাধ্যতামূলক। এই ব্যবস্থায়, সারাদিনের সমস্ত সাংসারিক কর্মকাণ্ড - যেমন ঘরদোর পরিষ্কার, রান্না থেকে শুরু করে বাচ্চাদের দেখাশোনা, পড়ানো, খাইয়ে দেওয়া, ঘুম পাড়ানো, প্রয়োজনে গাড়ি-চালক থেকে মেকানিক, প্লাম্বার থেকে মালি হওয়া; এই সব কিছুর দায়িত্ব বহন আর পালন করা এই রোবো-সেবকদের নিত্যদিনের কাজ। এতে নিপুণতা আর দক্ষতার সাথে যেমন কাজকর্ম সম্পন্ন করা যায়, তেমনই পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার ওপর ক্রমে প্রশ্ন ওঠে। এ তো গেল বিগত শতাব্দী শেষ সময়ের কথা। এই ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত সাফল্য পেয়ে ফ্যামিলি সিস্টেম উঠিয়ে দেওয়ার আইন জারি হয় পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে। তার সাথে বৃদ্ধি পায় রোবো-সেবকদের কর্মক্ষেত্র। আগে শুধু ঘরের অন্দরমহলে এক শ্রেণীর রোবো-সেবকেরা কাজ করত। এরপর এমনই বহু বিভিন্ন শ্রেণীর রোবো-সেবকেরা নিয়োজিত হতে শুরু হলো পৃথিবীর প্রায় সমস্ত কর্মসংস্থানে; বিজ্ঞান, যুদ্ধ, বাণিজ্য, গবেষণা - কিছুই বাদ রইলো না। বাইশ-শো শতাব্দীর মাঝামাঝি আর একটাও নিউক্লিয়ার পরিবার অবশিষ্ট রইলো না। সমগ্র বিশ্বের সমবেত অভিমতে আর সম্মিলিত রায়ে, মানুষের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা অর্জন করার প্রয়াসে এখন পরিবার গোত্রে থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 

এ ছাড়াও সংযুক্ত হয়েছে ভিন্ন পন্থায় বিশ্বনাগরিক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার উপায়। বাচ্চা জন্ম দেওয়ার বিপুল শ্রম এখন আর মানুষকে বহন করতে দেয় না সরকার। এর মুখ্য কারণ শুধুমাত্র মানব-সম্পদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ভয়ে নয়, এর পেছনে কাজ করে বিশ্বনাগরিক পরিসংখ্যান নিয়ন্ত্রণ সমিতি। মানব সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রেখে তবেই নতুন প্রোডাক্ট, অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টির কথা ভাবা হয়। এই নব্য শতাব্দীতে, পৃথিবীর সমস্ত বাচ্চা সৃষ্ট হয় 'পড ইনকিউবেশন' পদ্ধতিতে, বিশেষ নার্সারিতে। 'পড' মায়ের গর্ভের সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্রতিলিপি। প্রতিটি ফেসিলিটিতে হাজারখানেক এমন পডের ব্যাবস্থা। 'আর্টিফিসিয়াল ইনকিউবেটর' অথবা পড তামাম দুনিয়ার অত্যাধুনিক নব প্রজন্ম তৈরি করার বিপুল ঝাঁ-চকচকে কারখানা!